
শার্শা,যশোর প্রতিনিধি।। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ঘোষিত সর্বশেষ মনোনয়ন তালিকায় যশোর-১ (শার্শা) আসনে দলের সাবেক বহিষ্কৃত নেতা মফিকুল হাসান তৃপ্তির নাম ঘোষণার পর থেকে স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীরা অভিযোগ করেছেন, দীর্ঘদিন নিষ্ক্রিয় থাকা ও অতীতের বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের কারণে এ মনোনয়ন স্থানীয়ভাবে ব্যাপক হতাশা সৃষ্টি করেছে।
অতীতের বিতর্ক ও দলত্যাগের ইতিহাস ও তৃণমূল নেতাদের অভিযোগ, ওয়ান-ইলেভেনের সময় তৃপ্তি তৎকালীন মহাসচিব আব্দুল মান্নান ভূঁইয়ার ঘনিষ্ঠ হয়ে বিএনপি ভাঙার অপচেষ্টায় যুক্ত ছিলেন। এ কারণে পরবর্তীতে তাঁকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। স্থানীয় সূত্রমতে, ২০০৭ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত এবং পরবর্তীতে ২০১৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত তিনি শার্শা অঞ্চলের কোনো রাজনৈতিক বা দলীয় কর্মসূচিতে অংশ নেননি।
এমনকি তৃপ্তি দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গেও যোগাযোগ রাখেননি।স্থানীয় নেতারা বলছেন, মফিকুল হাসান তৃপ্তি দীর্ঘ সময় নিষ্ক্রিয় থাকায় তাঁর প্রতি এলাকার প্রায় ৭০–৮০ শতাংশ ভোটারের বিরূপ মনোভাব গড়ে উঠেছে।
১৭ বছর ধরে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ ও উঠেছে এই নেতার বিরুদ্ধে। বিএনপি তৃণমূলের অনেক নেতা অভিযোগ করেছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে প্রভাব বিস্তারের জন্য তৃপ্তি তার ব্যাক্তিগত ঘনিষ্ঠজনদের মাধ্যমে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা ও যশোর-১ আসনের সাংসদ আফিল উদ্দীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন। এমনকি ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে তৃপ্তি বিএনপি থেকে বহিষ্কার থাকায় তার বেশকিছু অনুসারীরা প্রকাশ্যে বিএনপির চার দলীয় জোট প্রার্থীর বিপক্ষে ভোট করেন, তারা সরাসরি আওয়ামীলীগের নৌকা প্রতীকের নির্বাচন করেন,
এছাড়া স্থানীয়ভাবে আলোচিত ‘সোনা পাচারকারী মাছ কুদ্দুস’-এর সঙ্গে মিলে বিএনপির নির্যাতিত নেতাকর্মীদের নামে মামলা দিয়ে আর্থিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। কুদ্দুস প্রকাশ্য জনসভায় আওয়ামী সাংসদকে ‘রুপোর নৌকা’ উপহার দিয়ে এলাকায় আলোচিত হয়েছিলেন। আরও অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগের সময় ওই ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের সহায়তায় বিএনপির সভা-সমাবেশ নস্যাৎ করা এবং তথ্য সরবরাহে সহযোগিতা করেছেন তৃপ্তি। ০৫ আগস্ট পরবর্তী তৃপ্তির সহযোগীতায় উপজেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক পদে অধিষ্ঠিত হন এই কুদ্দুস।
হামলা- সহিংসতা ও দখলবাজির অভিযোগ ও রেয়েছে তার অনুসারীদের নামে। গত ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে শার্শা উপজেলায় তৃপ্তির সমর্থিত একটি গ্রুপের বিরুদ্ধে সহিংসতার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় সূত্র জানায়, তৃপ্তির মদদপুষ্ট মুক্ত বাহিনী নিজামপুর ইউনিয়ন যুবদল নেতার ওপর হামলা চালিয়ে তাঁকে গুরুতর আহত করে এবং একই ইউনিয়নের কন্দর্পপুর গ্রামের কয়েকজন বিএনপি নেতাকর্মীর বাড়িঘর পুড়িয়ে দেয়।
একইভাবে কায়বা ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের কর্মীদের সঙ্গে নিয়ে বিএনপিতে যোগদান করার ঘটনায় তৃপ্তি ঘনিষ্ঠ নেতাদের বিরুদ্ধে গুলি বর্ষণেরও অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগ রয়েছে, এই সময় স্থানীয়ভাবে আওয়ামীপন্থী হিসেবে পরিচিত উপজেলা বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক কুদ্দুস আলী বিশ্বাস ওরফে মাছ কুদ্দুসের নেতৃত্বে এসব ঘটনা ঘটে। বিষয়টি বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশ পেলেও দলের পক্ষ থেকে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এছাড়াও ইউনিয়ন পরিষদ কতৃক চাউল আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে তৃপ্তি অনুসারী রুহুল কুদ্দুস নামে এক বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে, তার অভিযোগ প্রমান হওয়ায় তার পদ স্থগিত করে জেলা বিএনপি, এছাড়াও তৃপ্তি অনুসারী নব্য বিএনপিদের বিরুদ্ধে রয়েছে শার্শা উপজেলার প্রত্যান্ত অঞ্চলে খাল-বিল ও বাওড় দখলের অভিযোগ।
স্থানীয় কর্মীদের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় যাঁরা বিএনপির মাঠে ছিলেন না, এখন তাঁদেরই নিয়ে তৃপ্তির নির্বাচনী প্রচারণা চলছে। এতে দীর্ঘদিন ধরে দলের জন্য ত্যাগী ও নির্যাতিত নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।
তৃণমূলের এক নেতা বলেন, “যাঁরা দুঃসময়ে মাঠে ছিলেন না, আজ তারাই তৃপ্তির পোস্টার লাগাচ্ছেন। এতে বিএনপির প্রকৃত কর্মীরা বঞ্চিত হচ্ছেন।”
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান সম্প্রতি বিবিসি বাংলাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, মনোনয়ন বাছাইয়ে তরুণদের সম্পৃক্ততা, স্থানীয় সমস্যাবোধ, প্রবীণ ও নারীদের সঙ্গে সুসম্পর্ক, ত্যাগ এবং জনপ্রিয়তাকে গুরুত্ব দেওয়া হবে।
স্থানীয় নেতাকর্মীদের দাবি, মফিকুল হাসান তৃপ্তির মধ্যে এসব মানদণ্ডের কোনোটি নেই।
তরুণ প্রজন্মের নেতাদের অভিমত, ১৯৯৬ সাল থেকে একই ব্যক্তিকে মনোনয়ন দেওয়ায় স্থানীয় রাজনীতিতে নতুন নেতৃত্বের উত্থান বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
তাঁদের মতে, ০৫ আগস্টের পর পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় শার্শায় তরুণ, ত্যাগী ও সক্রিয় নেতাকে মনোনয়ন দেওয়ার প্রত্যাশা ছিল সবার। কিন্তু পুরনো ও বিতর্কিত প্রার্থী ঘোষণায় হতাশা আরও বেড়েছে।
বিএনপির দায়ীত্বে থাকা একাধিক নেতারা ভিন্ন ভিন্ন মতামত পোষন করেছেন।
কাইবা ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি মোঃ রবিউল ইসলাম, ডিহি ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি ওলিয়ার রহমান, সাধারণ সম্পাদক মোঃ আব্দুল জব্বার লক্ষণপুর ইউনিয়ন বিএনপি’র সভাপতি খোকন, সাধারণ সম্পাদক শামসুর রহমান, নিজামপুর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আব্দুস সালাম, বাগ আচড়া ইউনিয়ন বিএনপির সেক্রেটারি জাহাঙ্গীর আলম, উলাসী ইউনিয়ন বিএনপি সাধারণ সম্পাদক রুহুল আমিনসহ একাধিক নেতার মুখে হতাশার ছাপে ভেষে ওঠে বিগত দিনের বিএনপির দুর্দিনের কথা।
আওয়ামী লীগ কর্তৃক নির্যাতিত বিএনপি’র নেতাদের কথা একাধিক মামলা হামলার শিকার হওয়া নেতাদের কথা। তারা বলেন নির্বাচনের মনোনয়ন পরিবর্তন না হলে বিএনপি তৃণমূল নেতাকর্মীদের হতাশায় বিএনপি’র নির্বাচনের ফলাফল ভালো নাও হতে পারে।
বিএনপির তৃণমূলের একাধিক নেতা বলেন, “দলের জন্য যারা জীবন বাজি রেখে লড়েছে, তাদের বাদ দিয়ে একজন নিষ্ক্রিয় ও বিতর্কিত ব্যক্তিকে মনোনয়ন দেওয়া আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত হতে পারে।”

