
যন্ত্রের গর্জনে চাপা পড়ে গেছে গরুর ঘণ্টার শব্দ।
মোঃ মনিরুজ্জামান চৌধুরী, কালিয়া (নড়াইল)।।ভোরের আলো ফোটার আগেই একসময় নড়াগাতী–কালিয়ার মাঠে নেমে পড়তেন কৃষকেরা। কাঁধে হাল, সঙ্গে দু’টি গরু—নির্বাক সঙ্গীর মতো পাশে দাঁড়িয়ে থাকত তারা। গরুর গলায় ঝোলানো ঘণ্টার টুংটাং শব্দে ঘুম ভাঙত গ্রামের। কাদামাটিতে হালের আঁচড়ে তৈরি হতো নতুন ফসলের আশা। সেই চিরচেনা দৃশ্য এখন আর চোখে পড়ে না বললেই চলে।
কালের স্রোতে নড়াগাতীর মাঠে এসেছে ট্রাক্টর ও পাওয়ার টিলার। যন্ত্রের গর্জনে চাপা পড়ে গেছে গরুর ঘণ্টার শব্দ। আধুনিক কৃষিযন্ত্র জমি চাষকে করেছে দ্রুত ও সহজ, বাড়িয়েছে উৎপাদন। তবে এর আড়ালে নীরবে হারিয়ে যাচ্ছে শতাব্দীপ্রাচীন হালচাষ এবং কৃষকের সঙ্গে গরুর আত্মিক সম্পর্ক।
নড়াগাতীর বাগুডাঙ্গা গ্রামের কৃষক টুলু মোল্লা স্মৃতিচারণ করে বলেন, “হালের গরু শুধু চাষের উপকরণ ছিল না—ছিল পরিবারেরই একজন। গরুর যত্ন নেওয়া, তাদের সঙ্গে কথা বলা, মাঠে কাজের ফাঁকে আদর—এসবই ছিল আমাদের জীবনের অংশ।” তিনি জানান, এখন গরু নেই, সেই আবেগও নেই। অনেকেই গরু বিক্রি করে দিয়েছেন, আবার কেউ কেউ পুরোপুরি কৃষিকাজ ছেড়ে অন্য পেশায় চলে গেছেন।
একসময় গবাদিপশু পালনকে ঘিরে গড়ে উঠেছিল গ্রামীণ অর্থনীতির একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ চক্র। গোবর থেকে তৈরি হতো জৈব সার ও জ্বালানি। কিন্তু যান্ত্রিক কৃষির প্রসারে সেই পরিবেশবান্ধব চর্চাও হারিয়ে যাচ্ছে। এতে প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের যে নিবিড় সম্পর্ক ছিল, তা ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে।
কালিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ জাহাঙ্গীর আলম বলেন, “আধুনিক কৃষি নিঃসন্দেহে উন্নয়নের প্রতীক। তবে ঐতিহ্যবাহী কৃষিচর্চা ও গ্রামীণ সংস্কৃতি সংরক্ষণের দিকেও নজর দেওয়া জরুরি। নইলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আর কোনোদিন হালের গরু নিয়ে মাঠে নামা কৃষকের সেই চিরচেনা দৃশ্য দেখবে না।”
নড়াগাতীর মাঠ আজও ফসল ফলায়, কিন্তু সেই মাঠে আর নেই গরুর পায়ের ছাপ। নেই কৃষকের সঙ্গে প্রকৃতির নীরব কথোপকথন। সময় বদলেছে, বদলেছে কৃষিও—তবু প্রশ্ন থেকে যায়, উন্নয়নের দৌড়ে আমরা কি আমাদের শিকড়কেই হারিয়ে ফেলছি?

