কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে ব্যস্ত সময় পার করছে পাইকগাছার কামার শিল্পীরা
অরুণ কুমার বিশ্বাস, পাইকগছাা,(খুলনা) : আর মাত্র ৭ দিন পরই মুসলমানদের অন্যতম বৃহৎ ধর্মীয় উৎসব ঈদুজ্জোহা( বকরিদ )। আসন্ন কোরবানির ঈদের কথা মাথায় রেখে নতুন আশায় বুক বেঁধে কামারশিল্পীরা ব্যস্ত সময় পার করছে।
প্রাণঘাতী ভাইরাস করোনার প্রাদুর্ভাবের কারণে গত দুই বছর পর্যাপ্ত পশু কোরবানী হয়নি। প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাসের প্রভাবে লকডাউনের কারণে কামার শিল্পেও প্রভাব পড়েছিল।করোনা পরিস্থিতিতে গত দুই বছর তৈরী সরঞ্জাম তেমন একটা বিক্রি হয়নি।তবে অধিদফতরের কর্মকর্তারা মনে করছেন, এবার প্রেক্ষাপট ভিন্ন। করোনা নেই। ফলে গত দুই বছরের চেয়ে কোরবানিও বেশি হবে।যারা গত দুই বছর তৈরী সরঞ্জাম বিক্রি করতে পারেনি তারা কোরবানী ঈদের কথা চিন্তা করে নতুন ভাবে স্বপ্ন বুনছে । গত দুই বছরের অবিক্রিত থাকা সরঞ্জাম এবারের কোরবানিতে যুক্ত হবে।আর রাত-দিনের কথা ভ’লে গিয়ে কাজ করে চলেছে। চলছে হাঁপর , পুড়ছে কয়লা,জ্বলছে আগুন , আর সেই আগুনে পুড়ছে লহা। রাত-দিন এক করে কর্মব্যস্ত সময় পার করছে কামার শিল্পীরা। হতুড়ি দিয়ে লোহা পিঠানো টুংটাং শব্দে মুখরিত কামার শালার আশ পাশ এলাকা। কোরবানির পশু জবাই,চামড়া ছাড়ানো আর মাংস তৈরীর কাজে ব্যবহৃরিত চাপাতি, দা, ছুরিসহ বিভিন্ন ধারালো অস্ত্র তৈরিতে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন পাইকগাছার কামার শিল্পীরা। বাপ,ঠাকুর দার পেশা হারিয়ে যেতে বসা বাংলার প্রাচীন কামারশিল্প যেন হঠাৎ করে প্রাণ ফিরে পেয়েছে। এখন আর দম ফেলার ফুসরত নেই কামার পাড়ার শিল্পীদের। নাওয়া,খাওয়া , ঘুম,আরাম ভ’লে গিয়ে দিন-রাত সমান তালে লোহা পেঠানো টুং-টাং শব্দ আর হাফরের ফুসফাস শব্দে মুখরিত হয়ে উঠেছে কপিলমুনি শহর সহ উপজেলার প্রতিটি কামার শালা।
আর মাত্র ৭ দিন পর ঈদুজ্জোহা। কপিলমুনি শহর, কাছিঘাটা,গোলাবাটি,উত্তর শলুয়া, মামুদকাটি,আকড়খাটা সহ বিভিন্ন হাট বাজার এবং কামার বাড়িতে কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে পশু জবাইয়ের ছোরা, চাপাতি, চাকু,দা,বটি, ছোট ুবড় কুরালসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম তৈরি করছে কামাররা।তাছাড়া তদের পছন্দমত বিভিন্ন সাইজের ছোট-বড় ধারালো অস্ত্র তৈরি করছে । সারা বছর টুকি-টাকি কাজ থাকলেও কোরবানির ঈদের সময় কামার শিল্প মুখরিত হয়ে ওঠে । কামার শিল্পীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এ সময় দোকানে পুরাতন অস্ত্র মেরামত ও নতুন অস্ত্র বানানোর ভীড় শুরু হয় । ঈদের আগের দিন পর্যন্ত রাতে - দিনে এ ব্যস্ততা থাকবে। বর্তমানে আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে কামার শিল্পে।বৈদ্যুতিক সান দিযে বিভিন্ন সরঞ্জাম সান দেওয়া হয় ।আর হাফর বা যাতা দিয়ে বাতাস দেওয়ার জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে বৈদ্যুতিক মটর।
গোলাবাড়ি মোড়ে অবস্থিত কামারশালার শিল্পী রনজিৎ কর্মকার, চৈতন্য কর্মকার ,রবিন কর্মকার,সন্তোষ কর্মকার ও সোনা কর্মকার বলেন, লোহা ও কয়লার দাম অনেক বেড়ে গেছে । বর্তমানে সাধারন লোহা ৭০ টাকা থেকে ৮০ টাকা ও গাড়ীর পাতি ৯০টাকা দরে প্রতি কেজি কিনতে হচ্ছে । এছাড়া জাহাজ ভাঙ্গা লোহার দাম আরো একট ুবেশি দরে কিনতে হয় । কর্মকার শিল্পীরা আরও বলেন সম্পূণর্ পোলাদ দিয়ে তৈরী করা নতুন চাপাতি তৈরির মজুরি ৫শত থেকে ৭শত টাকা। আর আমাদের মত তৈরি করা ছোট চাপাতি ৫শত টাকা, বড় চাপাতি ৭শত থেকে ৮শত টাকা ,বড় ছোরা ৩শত থেকে সাড়ে ৩শতটাকা, চাকু ৫০ টাকা থেকে দেড় শতটাকা, ছোট বটি তিন শত থেকে সেিড় তিন শত টাকা,বড় বটি চার শত থেকে সাড়ে চার ও পাঁচ শত টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে ।
উত্তর সলুয়া গ্রামে নিজেদের বাড়িতে অবস্থিত কামারশালার শিল্পী বিশু কর্মকার ও গনেস কর্মকার জানান, এই পেশায় আমরা খুব অবহেলিত । বর্তমানে লোহার দাম বেশী হলেও সেই অনুযাই আমাদের তৈরি জিনিসের দাম আমরা পাইনা ।ফলে সারা বছর সংসার চালাতে খুবই কষ্ট হয়। বছরে একবার কোরবানির ঈদের সময় পশু জবাইয়ের কাজে ব্যবহৃত সরঞ্জামের চাহিদা থাকায় কাজও বেশি হয় । আর বছরের অন্য সময় তেমন কোন কাজ থাকে না ।সারা বছর টুক-টাক নূতন -পুরানো কাজ করে অনেক কষ্টে সংসার চালাতে হয় । তাই কামার শিল্পীরা বর্তমানে অবহেলিত । তবুও বাপ-ঠাকুরদার পেশাকে টিকিয়ে রাখতে অনেক কষ্টের মধ্যেও এ পেশাকে আকড়ে ধরে কাজ করে যাচ্ছি। সমস্যার আবর্তে কর্মকার পরিবারের অনেকেই পিতৃ পুরুষের ব্যবসা ছেড়ে এখন ধরেছে অন্য পেশা। অনেকেই হয়েছেন দিন মজুর, হয়েছেন ভ্যান চালক কিংবা ধরেছেন অন্য কোন ব্যবসা। অনেকে আবার অন্য ব্যবসার মাঝে চালিয়ে যাচ্ছেন কোন মতে তাদের পূর্ব পুরুষের জাত পেশা।
