ঢাকা বুধবার ২৬ আগস্ট ২০২৬ ১১ ই ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ ২৯ ই জিলহজ, ১৪৪৮ হিজরী
Ad

মাছের ঘেরের বাঁধে সবজির বাম্পার ফলন, দাম নেই—হতাশ সাতক্ষীরার কৃষক

প্রকাশিত: ২৫ আগস্ট ২০২৬, মঙ্গলবার, সময়ঃ ০১.১০ পি.এম
মাছের ঘেরের বাঁধে সবজির বাম্পার ফলন, দাম নেই—হতাশ সাতক্ষীরার কৃষক
www.dailyranggaprovat.com

মোঃ আহাদুল্লাহ সানা, সাতক্ষীরা : সাতক্ষীরার বিভিন্ন উপজেলার মাছের ঘেরের বাঁধে এবার সবজির বাম্পার ফলন হয়েছে। ঘেরের পাড় ও বাঁধজুড়ে শোভা পাচ্ছে লাউ, মিষ্টি কুমড়া, শসা, ঝিঙে, চিচিঙ্গা, করলা, পটল, বেগুন, ঢেঁড়সসহ নানা ধরনের সবজি। অনুকূল আবহাওয়া ও কৃষকদের পরিচর্যায় ফলনও হয়েছে আশানুরূপ। কিন্তু উৎপাদন ভালো হলেও বাজারে কাঙ্ক্ষিত দাম না থাকায় মুখে হাসি নেই কৃষকদের। উৎপাদন খরচ তুলতে না পেরে অনেক কৃষক হতাশ হয়ে পড়েছেন।

সাতক্ষীরার উপকূলীয় অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে মাছের ঘেরের পাশাপাশি ঘেরের বাঁধে সবজি চাষ করে আসছেন স্থানীয় কৃষকরা। অল্প জমিতে বাড়তি আয় এবং পরিবারের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি বাজারে সবজি বিক্রি করে নগদ অর্থ পাওয়ার সুযোগ থাকায় দিন দিন ঘেরের বাঁধে সবজি চাষ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এবারও জেলার বিভিন্ন এলাকায় ঘেরের বাঁধে ব্যাপক পরিমাণে সবজি আবাদ করেছেন কৃষকরা।

সরেজমিনে জেলার বিভিন্ন এলাকার মাছের ঘেরের বাঁধ ঘুরে দেখা যায়, সবুজে ছেয়ে গেছে ঘেরের পাড়। কোথাও মাচায় ঝুলছে সারি সারি লাউ ও ঝিঙে, কোথাও মাটিতে বিছিয়ে আছে মিষ্টি কুমড়া ও শসার লতা। আবার কোথাও করলা, চিচিঙ্গা ও পটলের গাছে ভরে গেছে ঘেরের বাঁধ। কৃষকদের ব্যস্ত সময় কাটছে সবজি সংগ্রহ ও বাজারজাত করার কাজে।

কৃষকরা জানান, চলতি মৌসুমে বীজ, সার, কীটনাশক, বাঁশ, দড়ি, শ্রমিকের মজুরি ও সেচসহ সবকিছুর খরচ বেড়েছে। সেই তুলনায় বাজারে সবজির দাম অনেক কম। ফলে ভালো ফলন হলেও উৎপাদন খরচ বাদ দিয়ে কৃষকের হাতে তেমন অর্থ থাকছে না।

একাধিক কৃষক বলেন, কয়েক মাস আগে যখন সবজি আবাদ শুরু করা হয়, তখন বাজারে দাম ভালো ছিল। সেই আশায় অনেকেই বেশি জমিতে সবজি চাষ করেন। কিন্তু এখন একসঙ্গে অনেক এলাকায় সবজি উঠতে শুরু করায় বাজারে সরবরাহ বেড়ে গেছে। ফলে পাইকাররা কম দামে সবজি কিনছেন। কৃষকের কাছ থেকে কম দামে কিনলেও ভোক্তা পর্যায়ে সবজির দাম তুলনামূলক বেশি থাকার অভিযোগও রয়েছে।

কৃষকদের ভাষ্য, মাঠ থেকে উৎপাদিত সবজি স্থানীয় বাজারে নিয়ে যাওয়ার পর অনেক সময় পরিবহন খরচই উঠে আসে না। পাইকাররা যে দাম বলেন, বাধ্য হয়ে সেই দামেই সবজি বিক্রি করতে হয়। সবজি বেশি দিন সংরক্ষণ করার সুযোগ না থাকায় কম দাম হলেও বিক্রি করে দিতে হয়। এতে একদিকে কৃষকের পরিশ্রম ও উৎপাদন খরচ উঠছে না, অন্যদিকে নষ্ট হওয়ার আশঙ্কায় আরও কম দামে সবজি বিক্রি করতে হচ্ছে।

ঘেরের বাঁধে সবজি চাষ করা এক কৃষক বলেন, “এবার ফলন খুব ভালো হয়েছে। গাছে গাছে সবজি ধরেছে। কিন্তু বাজারে দাম একেবারেই কম। জমিতে যে টাকা খরচ করেছি, সেই টাকা উঠবে কি না তা নিয়ে চিন্তায় আছি। ভালো ফলন পেয়েও যদি ন্যায্য দাম না পাই, তাহলে আমাদের লাভ কোথায়?”

আরেক কৃষক জানান, ঘেরের বাঁধে সবজি চাষে আলাদা করে বড় জমি প্রয়োজন হয় না। মাছের ঘেরের পাড়ের জমি ব্যবহার করেই সবজি উৎপাদন করা যায়। এতে একই জমি থেকে মাছের পাশাপাশি সবজি উৎপাদন সম্ভব হয়। কিন্তু বাজার ব্যবস্থাপনা দুর্বল হওয়ায় উৎপাদনের সুফল কৃষকের ঘরে পৌঁছাচ্ছে না।

স্থানীয় কৃষকদের মতে, উৎপাদনের সময় কৃষকদের সংগঠিতভাবে বাজারজাত করার ব্যবস্থা থাকলে তারা ন্যায্য দাম পেতে পারেন। কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি সবজি সংগ্রহ করে বড় বাজার বা শহরে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হলে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমবে। পাশাপাশি সবজি সংরক্ষণের জন্য হিমাগার ও আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলার দাবি জানিয়েছেন তারা।

কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাতক্ষীরার মাটি ও আবহাওয়া সবজি চাষের জন্য বেশ উপযোগী। বিশেষ করে মাছের ঘেরের বাঁধে বিভিন্ন ধরনের সবজি উৎপাদনের যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। ঘেরের বাঁধের অনাবাদি জমি ব্যবহার করে সবজি উৎপাদন করলে কৃষকের বাড়তি আয় যেমন বাড়ে, তেমনি স্থানীয় বাজারে সবজির সরবরাহও বৃদ্ধি পায়। তবে উৎপাদনের পাশাপাশি বাজার ব্যবস্থাপনা ও ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা জরুরি।

কৃষকদের অভিযোগ, মাঠ পর্যায়ে উৎপাদন খরচ ও বাজারদরের মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য তৈরি হয়েছে। কৃষক যখন উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন না, তখন ভবিষ্যতে সবজি চাষে আগ্রহ হারানোর আশঙ্কা রয়েছে। এতে একদিকে কৃষকের ক্ষতি হবে, অন্যদিকে স্থানীয়ভাবে সবজি উৎপাদনও কমে যেতে পারে।

কৃষকরা আরও জানান, সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে কৃষকদের বাজারদর সম্পর্কে আগাম তথ্য দেওয়া, সরাসরি বাজারজাতকরণের ব্যবস্থা করা এবং কৃষক সমবায় বা উৎপাদক সংগঠন গড়ে তোলা গেলে তারা উপকৃত হবেন। একই সঙ্গে কৃষি কর্মকর্তাদের মাধ্যমে রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ, আধুনিক চাষাবাদ ও সংরক্ষণ বিষয়ে নিয়মিত পরামর্শ দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।

সাতক্ষীরার ঘেরের বাঁধে এবার সবজির বাম্পার ফলন কৃষকদের সম্ভাবনার নতুন দুয়ার খুললেও ন্যায্য দাম না পাওয়ায় সেই সম্ভাবনাই এখন হতাশায় পরিণত হয়েছে। কৃষকের ঘাম ও শ্রমে উৎপাদিত সবজির সঠিক মূল্য নিশ্চিত করা গেলে ঘেরের বাঁধের এই চাষ শুধু কৃষকের আয় বাড়াবে না, বরং থজেলার কৃষি অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তাই উৎপাদনের পাশাপাশি কৃষকের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে কার্যকর বাজার ব্যবস্থাপনা ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত পদক্ষেপ এখন সময়ের দাবি।