ঢাকা সোমবার ১৯ অক্টোবর ২০২৬ ৩ ই কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ ২৪ ই জিলহজ, ১৪৪৮ হিজরী
Ad

স্ক্রিন রিডারের সমস্যা সমাধান না হওয়ায় দৃষ্টি প্রতিবন্ধী গ্রাহকদের দুর্ভোগ

প্রকাশিত: ১৮ অক্টোবর ২০২৬, রোববার, সময়ঃ ০৩.৪১ পি.এম
স্ক্রিন রিডারের সমস্যা সমাধান না হওয়ায় দৃষ্টি প্রতিবন্ধী গ্রাহকদের দুর্ভোগ
www.dailyranggaprovat.com

খোকন আহম্মেদ হীরা : নগদ অ্যাপে স্ক্রিন রিডার (যেমন TalkBack বা VoiceOver) ঠিকমতো কাজ না করায় দৃষ্টি প্রতিবন্ধী গ্রাহকদের দুর্ভোগ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং স্পর্শকাতর সমস্যা। আর্থিক অন্তর্ভুক্তির এই যুগে মোবাইল ব্যাংকিং বা MFS অ্যাপগুলোর অ্যাক্সেসিবিলিটি (Accessibility) নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি হলেও, টেকনিক্যাল ত্রুটি বা নিয়মিত আপডেটে এই বিষয়টির প্রতি নজর না দেওয়ায় দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যবহারকারীরা স্বাধীনভাবে লেনদেন করতে পারছেন না।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, অ্যাপের অনেক গুরুত্বপূর্ণ বাটন বা আইকনে সঠিক লেবেল (Label) না থাকায় স্ক্রিন রিডার সেগুলো পড়ে শোনাতে পারে না। ফলে গ্রাহক কোন বাটনে ট্যাপ করছেন (যেমন: সেন্ড মানি নাকি ক্যাশ আউট) তা বুঝতে পারেন না। পাশাপাশি পিন (PIN) নম্বর দেওয়ার সময় বা ওটিপি (OTP) কোড আসার পর স্ক্রিন রিডার সঠিকভাবে সাড়া না দিলে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী গ্রাহকদের অন্য কারো সাহায্য নিতে হয়। এতে তাদের ব্যক্তিগত পিন বা আর্থিক তথ্যের গোপনীয়তা নষ্ট হয় এবং প্রতারিত হওয়ার ঝুঁকি বৃদ্ধি পেয়েছে। একইসাথে টাকা পাঠানোর সময় কত টাকা লেখা হয়েছে, তা স্ক্রিন রিডার মুখে উচ্চারণ করে না। যেকারণে ভুল অঙ্কের টাকা চলে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। 

স্ক্রিন রিডার ব্যবহারকারী গ্রাহকরা জানিয়েছেন, প্রযুক্তি থাকা সত্ত্বেও ডিজিটাল মাধ্যমে স্বনির্ভর হওয়ার পরিবর্তে এই ত্রুটিগুলোর কারণে ব্যবহারকারীদের সবসময় পরিবারের অন্য সদস্য বা এজেন্টের ওপর নির্ভরশীল হয়ে থাকতে হচ্ছে। যেকারণে ডিজিটাল বাংলাদেশ থেকে স্মার্ট বাংলাদেশের পথে প্রযুক্তির অগ্রগতি দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলা। স্মার্টফোন, কম্পিউটার ও ল্যাপটপের মাধ্যমে আর্থিক লেনদেনসহ নানা ডিজিটাল সেবা মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে সহজ করার দাবি করা হলেও এসব সেবা দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য কতোটা ব্যবহারবান্ধব, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। 

বিশেষ করে নগদ অ্যাপে পিন প্রবেশের ক্ষেত্রে স্ক্রিন রিডার ব্যবহারে সমস্যার কারণে ভোগান্তিতে পড়ার অভিযোগ করেছেন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যবহারকারী মেহেদী হাসান। তাঁর দাবি, গত পাঁচ বছর ধরে বিষয়টি নিয়ে নগদ কাস্টমার কেয়ারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তারা কোন কার্যকরী সমাধান পাননি। এ ব্যাপারে তিনি (মেহেদী হাসান) সহ অন্যান্য গ্রাহকরা সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী ও উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের আশু হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

বরিশালের উজিরপুর উপজেলার বরাকোঠা ইউনিয়নের গাজীরপাড় গ্রামের বাসিন্দা ও দ্বাদশ শ্রেনীর ছাত্র দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মেহেদী হাসানের অভিযোগে জানা গেছে, নগদ অ্যাপে পিন প্রবেশের সময় স্ক্রিন রিডার যথাযথভাবে কাজ না করায় তাদের স্বাধীনভাবে প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করতে সমস্যায় পড়তে হয়। এছাড়াও নগদের স্ক্রিন রিডার বেশ কিছু অ্যাপ সাপোর্ট করেনা। এসব সমস্যা সমাধানের জন্য তারা বিভিন্ন সময়ে কাস্টমার কেয়ারের সাথে যোগাযোগ করেছেন। প্রতিবারই সমস্যা সমাধানে কাজ করার আশ্বাস দেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত কার্যকর কোন সমাধান মেলেনি।

মেহেদী হাসান বলেন, দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য স্ক্রিন রিডার একটি গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক প্রযুক্তি। এটি স্মার্টফোন বা কম্পিউটারের পর্দায় থাকা লেখা, বোতাম, মেনু ও অন্যান্য উপাদান কণ্ঠস্বরের মাধ্যমে বুঝতে সাহায্য করে। কিন্তু কোনো অ্যাপ স্ক্রিন রিডারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হলে লগইন, পিন প্রবেশ কিংবা লেনদেনের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ সম্পন্ন করা কঠিন হয়ে পরে।

বিশেষ করে আর্থিক সেবায় এ ধরনের সমস্যা ব্যবহারকারীর স্বাধীনতা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও নিরাপদে লেনদেন সম্পন্ন করার সক্ষমতাকে প্রভাবিত করছে। অন্যের সহায়তা ছাড়া নিজের আর্থিক লেনদেন পরিচালনা করতে চাওয়া একজন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী গ্রাহকের জন্য এটি বাড়তি প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে।

মেহেদী হাসানের দাবি, একাধিক স্ক্রিন রিডার ব্যবহারকারীর সঙ্গে কথা বলেও তিনি বিভিন্ন ডিজিটাল সেবা ব্যবহারে একই ধরনের সমস্যার অভিজ্ঞতার কথা জানতে পেয়েছেন। তাঁর এই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন অ্যাপ, ওয়েবসাইট ও অনলাইন সেবার প্রবেশগম্যতা পর্যালোচনার দাবি উঠেছে।

শুধু স্মার্টফোনের অ্যাপ নয়, কম্পিউটার ও ল্যাপটপে ব্যবহৃত ওয়েবসাইট, অনলাইন ফরম, লগইন ব্যবস্থা এবং আর্থিক লেনদেনের বিভিন্ন ধাপও স্ক্রিন রিডার-উপযোগী হওয়া জরুরি। একই সঙ্গে পিন প্রবেশ, লেনদেন নিশ্চিতকরণ ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত নির্দেশনাগুলো যেন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যবহারকারীরা বুঝতে পারেন, তা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন, ২০১৩ রয়েছে। এছাড়া অন্তর্ভুক্তিমূলক ডিজিটাল সেবা তৈরিতে ‘Digital Service and Web Designing Guideline for Inclusive Accessibility 2022’ গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশিকা হিসেবে বিবেচিত। তবে আইন ও নির্দেশিকা থাকার পাশাপাশি ডিজিটাল সেবাগুলোর বাস্তব প্রবেশগম্যতা নিশ্চিত করা এবং ব্যবহারকারীদের অভিযোগের কার্যকর নিষ্পত্তি করাও জরুরি।

সংশ্লিষ্টদের মতে, ডিজিটাল সেবা সবার জন্য উন্মুক্ত করার পাশাপাশি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ব্যবহারোপযোগিতা নিশ্চিত করা অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রযুক্তিব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। এ জন্য অ্যাপ ও ওয়েবসাইট তৈরির সময় থেকেই স্ক্রিন রিডারসহ বিভিন্ন সহায়ক প্রযুক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্য পরীক্ষা করা এবং ব্যবহারকারীদের বাস্তব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা দরকার।

সচেতন নাগরিকদের দাবি, ডিজিটাল সেবা যদি সবার জন্য হয়, তাহলে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা কেন তা সমানভাবে ব্যবহার করতে পারবেন না। প্রযুক্তির প্রকৃত অগ্রগতি নিশ্চিত করতে হলে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্যও ডিজিটাল সেবা হতে হবে সহজলভ্য, নিরাপদ, প্রবেশগম্য ও স্বাধীনভাবে ব্যবহারের উপযোগী হবে। পাশাপাশি অভিযোগটি প্রযুক্তিগতভাবে যাচাই করে সমস্যার সমাধান এবং ভবিষ্যতে একই ধরনের ভোগান্তি এড়াতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট সেবার প্রবেশগম্যতা নিয়ে উদ্বিগ্ন ব্যবহারকারীরা।

মেহেদী হাসানের অভিযোগের ভিত্তিতে নাম প্রকাশ না করার শর্তে নগদের বরিশালের একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বিষয়টি সমাধানে আমাদের কিছুই করার নেই। তাই গ্রাহকদের এ অভিযোগের বিষয়টি অসংখ্যবার সংশ্লিষ্ট উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অবহিত করা হয়েছে। এ ব্যাপারে সরকারের পক্ষ থেকে কোম্পানীর প্রতিনিধিদের সাথে আলোচনাছাড়া প্রতিবন্ধী গ্রাহকদের অভিযোগের সমাধান হবে বলে মনে হচ্ছেনা।