"মাজারে কুমির ব্যবসা বন্ধ হোক !"
আজ থেকে প্রায় ৬০০ বছর আগে বাগেরহাটে এসেছিলেন আধ্যাত্মিক সুফি সাধক হযরত খানজাহান আলী (রহ.)। ইসলাম প্রচার করতে এসে তিনি সেখানে মসজিদের পাশে খনন করেছিলেন বিশালাকৃতির একটি দিঘি। নিজের আধ্যাত্মিক ক্ষমতা প্রদর্শন করে মানুষকে ধর্মের পথে আনার জন্য তিনি কালাপাহাড় এবং ধলাপাহাড় নামে নদীর দুটি কুমির এনে মিঠা পানির দিঘিতে বন্দী করেছিলেন। তাঁর জীবদ্দশায় কুমির দুটি তাঁর হাতের ইশারায় চলতো বলে জনশ্রুতি রয়েছে। একটি পুরুষ এবং একটি নারী কুমির হওয়ায় তারা দিঘিতে বেশকিছু বাচ্চা দিয়েছিল। খানজাহান আলীর (রহ.) মৃত্যুর পরেও সেই কালাপাহাড়, ধলাপাহাড় এবং তাদের বংশধররা কয়েকশো বছর ধরে বেঁচেছিল।
পরবর্তীকালে অযত্ন-অবহেলা, পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট এবং প্রয়োজনীয় পরিচর্যা আর খাদ্যের অভাবে কালাপাহাড়, ধলাপাহাড় এবং তাদের বাচ্চা কুমিরগুলো একে একে মারা যেতে থাকে। চলতি শতাব্দীর শুরুর দিকে কুমিরশূন্য হয়ে পড়ে ঐতিহাসিক খানজাহান আলীর দিঘি। এতে মাজার ব্যবসায় ধ্বস নামে। পরে ২০০৫ সালে ভারত থেকে নতুন কুমির কিনে এনে খানজাহান আলীর দিঘিতে অবমুক্ত করা হয়। ঐতিহ্যের নামে মূলতঃ মাজার ব্যবসা টিকিয়ে রাখার জন্যেই নেওয়া হয় এই উদ্যোগ। দিঘিতে থাকা বর্তমানের এই কুমিরের সাথে হযরত খানজাহান আলী (রহ.), তাঁর বংশধর কিংবা তাঁর আধ্যাত্মিকতার কোনো সম্পর্ক নেই। তবে মাজার ব্যবসায়ী একদল ভন্ডের সাথে এই কুমিরের গভীর অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে।
আগত ভক্ত মাজার পূজারীরা আল্লাহর রহমত কামনা এবং তাদের মনোবাসনা পূর্ণ করার আশায় কুমিরের জন্য টাকা দেয়, খাবার দেয়। খাবার হিসেবে মুরগি, ছাগল এবং মাংস কিনে দেয়। তবে সেগুলো কুমিরের ভাগ্যে খুব একটা জোটে না। কুমিরের মুখের সামনে থেকে ঘুরিয়ে এনে সেগুলো আবার আরেক ক্রেতার কাছে বিক্রি করা হয়। মাজারের কাছে গড়ে উঠেছে আগরবাতি, মোমবাতি, তাগা, ফিতা, তাবিজ, কবজসহ রকমারি বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। নানা কৌশলে সেখানে চলে নানান প্রতারণা আর পর্যটকদের পকেট কাটার প্রতিযোগিতা। মাজার থেকে আয় হওয়া টাকা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ভাগবাটোয়ারা হয়। এই মাজার সিন্ডিকেটের সাথে জড়িত মাজারের খাদেম, স্বেচ্ছাসেবক নামধারী কিছু মাদকসেবী, সরকার দলীয় কতিপয় নেতা, স্থানীয় পুলিশ এবং প্রশাসনের কিছু অসাধু ব্যক্তি।
বাগেরহাটের সম্মানিত জেলা প্রশাসক মহোদয় সম্ভবত আমার ফ্রেন্ডলিস্টে আছেন। আমার এই লেখা যদি তার চোখে পড়ে তবে জনাবের প্রতি আমার উদাত্ত আহবান এবং বিনীত অনুরোধ থাকবে- দিঘির এই কুমিরকে অনতিবিলম্বে ঢাকা চিড়িয়াখানা, চট্টগ্রামের কুমির প্রজনন কেন্দ্র কিংবা সুন্দরবনের করমজল বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ কেন্দ্রে নিয়ে অবমুক্ত করা হোক। একটি মাংসাশী হিংস্র প্রাণিকে কোনো অবস্থাতেই একটি লোকালয়ের দর্শনীয় স্থানে রাখা যৌক্তিক নয়। এতে একদিকে যেমন মানুষ শিরক করার মতো পাপাচারে লিপ্ত হবে, অন্যদিকে ফাতেমার মতো অনাথ পথশিশুরা কুমিরের খাদ্যবস্তুতে পরিনত হবে। মাজার ব্যবসা টিকিয়ে রাখার স্বার্থে সেখানে আরেক দেশ থেকে কিনে আনা কুমির পালনের কোনো প্রয়োজন নেই।
লেখক: ❑ আরিফ আহমেদ মুন্না ✍️।।
সভাপতি, বরিশাল বিমানবন্দর প্রেসক্লাব।
