ঢাকা রোববার ১৯ জুলাই ২০২৬ ৪ ই শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ ২১ ই জিলহজ, ১৪৪৮ হিজরী
Ad

প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়নে পরিদর্শন ও আকস্মিক পরিদর্শনের প্রয়োজনীয়তা- ইউএনও আলী হাসান

প্রকাশিত: ০৬ জুন ২০২৬, শনিবার, সময়ঃ ০৯.১০ পি.এম
প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়নে পরিদর্শন ও  আকস্মিক পরিদর্শনের প্রয়োজনীয়তা- ইউএনও  আলী হাসান
www.dailyranggaprovat.com

কচুয়া (বাগেরহাট) প্রতিনিধি : একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার শিশুদের ওপর, আর শিশুদের ভবিষ্যৎ গড়ে ওঠে প্রাথমিক শিক্ষার ভিত্তির ওপর। বাংলাদেশে প্রাথমিক শিক্ষার বিস্তার উল্লেখযোগ্য হলেও এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করা। একটি বিদ্যালয়ে ভবন, আসবাবপত্র কিংবা শিক্ষাসামগ্রী থাকলেই শিক্ষার মান উন্নত হয় না; বরং প্রয়োজন নিয়মিত পাঠদান, শিক্ষকদের দায়বদ্ধতা, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি এবং একটি কার্যকর শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ। এসব বিষয় নিশ্চিত করার অন্যতম কার্যকর উপায় হলো নিয়মিত ও আকস্মিক পরিদর্শন।


পরিদর্শনকে অনেক সময় শুধুমাত্র প্রশাসনিক কার্যক্রম হিসেবে দেখা হয়। বাস্তবে এটি শিক্ষা উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। একজন পরিদর্শক যখন বিদ্যালয়ে যান, তখন তিনি শুধু উপস্থিতি রেজিস্টার দেখেন না; বরং পাঠদানের মান, শ্রেণিকক্ষের পরিবেশ, শিক্ষার্থীদের শেখার অবস্থা, বিদ্যালয়ের পরিচ্ছন্নতা এবং সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে ধারণা লাভ করেন। এর মাধ্যমে বিদ্যালয়ের শক্তি ও দুর্বলতা চিহ্নিত করা সম্ভব হয় এবং প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদান করা যায়।


বাগেরহাটের কচুয়া উপজেলায় বর্তমানে ৯৫টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এসব বিদ্যালয়ে প্রতিদিন হাজারো শিক্ষার্থী শিক্ষা গ্রহণ করছে। উপজেলা প্রশাসন, শিক্ষা বিভাগ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিয়মিত পরিদর্শনের ফলে বিদ্যালয়গুলোতে ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। বিশেষ করে শিক্ষকদের সময়ানুবর্তিতা, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি এবং বিদ্যালয়ের পরিচ্ছন্নতা বৃদ্ধিতে পরিদর্শন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অনেক ক্ষেত্রে একটি ছোট পর্যবেক্ষণ বা পরামর্শও বিদ্যালয়ের কার্যক্রমে বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয়।


তবে কেবল পূর্বনির্ধারিত পরিদর্শন সব সময় বাস্তব চিত্র তুলে ধরে না। কারণ নির্ধারিত পরিদর্শনের খবর আগে থেকেই জানা থাকলে বিদ্যালয়গুলো স্বাভাবিকভাবেই বিশেষ প্রস্তুতি গ্রহণ করে। ফলে সেদিনের চিত্র অনেক সময় দৈনন্দিন বাস্তবতার প্রতিফলন হয় না। এখানেই আকস্মিক পরিদর্শনের গুরুত্ব। আকস্মিক পরিদর্শনের মাধ্যমে বিদ্যালয়ের প্রকৃত অবস্থা জানা যায়। শিক্ষকরা নিয়মিত শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করছেন কি না, শিক্ষার্থীরা সময়মতো বিদ্যালয়ে আসছে কি না, শিক্ষার পরিবেশ কতটা কার্যকর—এসব বিষয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া সম্ভব হয়।


মাঠপর্যায়ে দেখা যায়, আকস্মিক পরিদর্শনের ফলে বিদ্যালয়ে দায়িত্ববোধ বৃদ্ধি পায়। শিক্ষক ও সংশ্লিষ্টরা উপলব্ধি করেন যে যেকোনো সময় তাদের কার্যক্রম মূল্যায়ন করা হতে পারে। ফলে তারা দায়িত্ব পালনে আরও সচেতন হন। এটি কোনো ভয়ভীতির পরিবেশ তৈরি করে না; বরং একটি পেশাগত জবাবদিহিতার সংস্কৃতি গড়ে তোলে, যা শিক্ষার মানোন্নয়নের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।


পরিদর্শনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সমস্যা শনাক্তকরণ। অনেক সময় বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকট, শ্রেণিকক্ষের স্বল্পতা, পানীয় জলের সমস্যা, শৌচাগারের অপ্রতুলতা কিংবা শিক্ষার্থীদের বিশেষ চাহিদার বিষয়গুলো দীর্ঘদিন অগোচরে থেকে যায়। নিয়মিত ও আকস্মিক পরিদর্শনের মাধ্যমে এসব সমস্যা দ্রুত চিহ্নিত করা সম্ভব হয় এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পারে। ফলে বিদ্যালয়ের সামগ্রিক পরিবেশ উন্নত হয় এবং শিক্ষার্থীরা আরও ভালোভাবে শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পায়।


তবে পরিদর্শনের উদ্দেশ্য কেবল ত্রুটি খোঁজা হওয়া উচিত নয়। একজন কার্যকর পরিদর্শক একই সঙ্গে একজন পরামর্শক ও অনুপ্রেরণাদাতা। তিনি শিক্ষকদের ভালো কাজের প্রশংসা করবেন, নতুন উদ্যোগকে উৎসাহিত করবেন এবং সমস্যার সমাধানে সহযোগিতা করবেন। ইতিবাচক ও সহযোগিতামূলক পরিদর্শন ব্যবস্থা শিক্ষকদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি করে এবং শিক্ষা কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করে তোলে।


একটি উন্নত বাংলাদেশ বিনির্মাণের লক্ষ্যে দক্ষ, সৃজনশীল ও মানবিক প্রজন্ম গড়ে তুলতে হলে প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়ন অপরিহার্য। আর সেই মানোন্নয়নের জন্য নিয়মিত ও আকস্মিক পরিদর্শনের কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন। বিদ্যালয়, শিক্ষক, অভিভাবক, শিক্ষা বিভাগ এবং প্রশাসনের সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে এই পরিদর্শন ব্যবস্থাকে আরও ফলপ্রসূ করা সম্ভব।


পরিশেষে বলা যায়, প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়ন কেবল পাঠ্যবই বা অবকাঠামোর ওপর নির্ভর করে না; এটি নির্ভর করে ধারাবাহিক তদারকি, জবাবদিহিতা এবং সহায়ক নেতৃত্বের ওপর। কচুয়া উপজেলার ৯৫টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ দেশের প্রতিটি বিদ্যালয়ে যদি কার্যকর ও আকস্মিক পরিদর্শন নিয়মিতভাবে পরিচালিত হয়, তাহলে শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নের পথ আরও সুগম হবে। কারণ একটি বিদ্যালয়ের সাফল্য কেবল তার ফলাফলে নয়, বরং প্রতিদিনের দায়িত্বশীল কার্যক্রমের মধ্যেই নিহিত থাকে।