মফস্বল সাংবাদিকতার আত্মকথন
মফস্বল সাংবাদিকদের অধিকাংশেরই কোনো নির্ধারিত বেতন নেই; জাতীয় বেতন স্কেল বা ওয়েজ বোর্ড থাকলেও মফস্বলে তা কার্যকর হয় না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তারা সংবাদ বা বিজ্ঞাপন সংগ্রহ থেকে কমিশন হিসেবে আয় করেন বা বিনা পারিশ্রমিকে কাজ করেন। তবে কিছু প্রথম সারির জাতীয় সংবাদমাধ্যমে জেলা প্রতিনিধিদের নির্দিষ্ট মাসিক সম্মানী দেওয়া হয়।বাংলাদেশে মফস্বল সাংবাদিকতার এই বেতনের চিত্রটি আরও পরিষ্কার করতে নিচে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেওয়া হলো:স্থায়ী বেতনের অভাব: মফস্বলের বেশিরভাগ পত্রিকার সংবাদদাতা, অনলাইন পোর্টাল বা স্থানীয় প্রতিনিধিরা কোনো বেতন পান না। উল্টো নিজ খরচে বা বিজ্ঞাপন থেকে আয় করে পত্রিকা চালাতে হয়।নামমাত্র সম্মানী: জাতীয় দৈনিক ও স্যাটেলাইট টেলিভিশনগুলোর জেলা প্রতিনিধিরা সাধারণত মাসে সম্মানী বা বেতন পেয়ে থাকেন, যা জীবনযাত্রার ব্যয়ের তুলনায় খুবই অপ্রতুল।** ওয়েজ বোর্ডের বাস্তবতা:** সরকার ঘোষিত নবম ওয়েজ বোর্ডের নিয়ম অনুযায়ী সাংবাদিকদের জন্য নির্দিষ্ট বেতন কাঠামো থাকার কথা থাকলেও, উপজেলা পর্যায়ে এর বাস্তবায়ন প্রায় নেই বললেই চলে।নীতিমালা ও সুরক্ষা দাবি: আর্থিক অনিশ্চয়তা মফস্বল সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় সংকট। এ কারণে সাংবাদিক ও বিভিন্ন প্রেস ক্লাব ফোরাম থেকে মফস্বল সাংবাদিকদের জন্য সুনির্দিষ্ট নীতিমালা, ন্যূনতম সম্মানজনক বেতন ও সুরক্ষার দাবি জোরালো হচ্ছে।মফস্বল সাংবাদিকদের কাজের ক্ষেত্র ও নিয়োগের ধরন অনুযায়ী আয়ের এই ভিন্নতা দেখা যায়।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের মফস্বলাঞ্চলে ভুঁইফোড় সাংবাদিকতার বিস্তার উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে গেছে। দায়িত্বশীল পেশাদার সাংবাদিকদের পাশাপাশি কিছু সুযোগসন্ধানী ব্যক্তি ‘সাংবাদিক’ পরিচয় ব্যবহার করে ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও সাধারণ মানুষের ওপর প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছেন। ফলে প্রকৃত সাংবাদিকতা যেমন প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে, তেমনি ভুক্তভোগীর পরিসরও দিন দিন বাড়ছে।
মফস্বলে ভুঁইফোড় সাংবাদিকতা বাড়ার অন্যতম কারণ হলো অনিয়ন্ত্রিতভাবে মিডিয়া কার্ড সরবরাহ। বিভিন্ন অনলাইনের নামে অগণিত ‘পোর্টাল’ সৃষ্টি হচ্ছে, যাদের অধিকাংশেরই নেই সরকারি নিবন্ধন, নেই কোনো সম্পাদকীয় নীতিমালা, নেই পেশাগত প্রশিক্ষণ। সুযোগসন্ধানীরা এসব ভুয়া পরিচয়পত্র ব্যবহার করে প্রশাসন, ব্যবসায়ী বা সাধারণ মানুষের ওপর চাপ সৃষ্টি করছেন।
স্থানীয় প্রশাসন ও ব্যবসায়ী মহলের অভিযোগ–কিছু ভুঁইফোড় সাংবাদিক সংবাদ প্রকাশের ভয় দেখিয়ে চাঁদা দাবি, ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধি বা প্রতিপক্ষকে হয়রানির মতো কাজে লিপ্ত হয়। এতে প্রকৃত সংবাদকর্মীদের ইমেজ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি সাধারণ মানুষ সাংবাদিকদের প্রতি আস্থাহীন হয়ে পড়ছে।
প্রশাসন প্রণীত নীতিমালা যথাযথভাবে প্রয়োগ না করায় ভুয়া পরিচয়ের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না। জনগণের অজ্ঞতা ও ভীতি ভুঁইফোড়দের সুযোগ করে দিচ্ছে। সাংবাদিক সংগঠনগুলোর দুর্বল ভূমিকা সঠিক বাছাই ও তদারকিতে ঘাটতি তৈরি করছে।
সাংবাদিকতার ন্যূনতম যোগ্যতা, প্রশিক্ষণ ও নীতিমালার বাধ্যবাধকতা করা। ভুয়া আইডি ও কার্ডের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা। মফস্বল সাংবাদিকদের জন্য স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া ও পরিচয় যাচাই এবং প্রকৃত সাংবাদিকদের সুরক্ষা ও অবস্থান শক্তিশালী করা। সঠিক সাংবাদিকতা বাঁচাতে সরকারের পদক্ষেপ নেওয়া খুবই জরুরি।
মফস্বলে ভুঁইফোড় সাংবাদিকতার দৌরাত্ম্য শুধু সাংবাদিকতার মানকেই ক্ষতিগ্রস্ত করছে না, বরং সামাজিক শান্তি ও প্রশাসনিক স্থিতিশীলতাকেও হুমকির মুখে ফেলছে। সময় এসেছে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে এসে অপেশাদারদের দৌরাত্ম্য বন্ধ করার। সত্য ও জনস্বার্থভিত্তিক সাংবাদিকতা টিকে থাকুক–এটাই সকল মহলের প্রত্যাশা।
লেখক: সহ: অধ্যাপক সাইফুল রহিম।
সাবেক সভাপতি, বাবুগঞ্জ উপজেলা প্রেসক্লাব।
বাবুগঞ্জ, বরিশাল।
