ঢাকা রোববার ১৯ জুলাই ২০২৬ ৪ ই শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ ২১ ই জিলহজ, ১৪৪৮ হিজরী
Ad

মহম্মদপুর উপজেলা পর্যায়ে ৫ ক্যাটাগরীতে নির্বাচিত শ্রেষ্ঠ জয়িতাদের সাফল্য গাথা

প্রকাশিত: ০২ জুলাই ২০২৬, বৃহস্পতিবার, সময়ঃ ০২.২৭ পি.এম
মহম্মদপুর উপজেলা পর্যায়ে ৫ ক্যাটাগরীতে নির্বাচিত শ্রেষ্ঠ জয়িতাদের সাফল্য গাথা
www.dailyranggaprovat.com

সুব্রত সরকার, মহম্মদপুর (মাগুরা) প্রতিনিধি : সরকারের মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের উদ্যোগে জয়িতা অন্বেষণে বাংলদেশ শীর্ষক আয়োজনে মহম্মদপুর উপজেলা মহিলা বিষয়ক কার্যালয়ের ব্যবস্থপনায় ২০২৫-২০২৬ অর্থ বছরে মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলায় ৫ ক্যাটাগরীতে ৫জন শ্রেষ্ঠ জয়িতা নির্বাচিত হয়েছে। এই পাঁচজন জয়িতা জীবন সংগ্রামে প্রচন্ড প্রতিকুলতা ও শতবাধা বিপত্তি ডিঙ্গিয়ে অদম্য প্রাণ শক্তি নিজ নিজ মহিমায় সাফল্যের দৃষ্টান্ত স্থাপন করে অন্যদের অনুকরনীয় হয়ে উঠেছেন। তারা অতীতে অনেক দুঃখ কষ্ট ও অভাব অনটন সহ্য করেও হতোদ্যম না হয়ে নিজেদের ঐকান্তিক চেষ্টায় সাফল্যের গৌরব গাথায় উজ্জল নক্ষত্র হয়ে উঠেছেন। 



মোছাঃ আঞ্জুমান আরা বেগম ঃ  


সফল জননী নারী। তিনি তিনি মাগুরা জেলার শ্রীপুর উপজেলার সোনাতুন্দি গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। জন্মের পর পিতা মাতার কাছে ধর্মীয় শিক্ষা লাভ করেন। পরবর্তীতে ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করেন। পরবর্তীতে পাশ^বর্তী মহম্মদপুর উপজেলার দীঘা ইউনিয়নের চৌবাড়িয়া গ্রামের মোঃ মাসুদুর রহমানের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। বিবাহিত জীবনে ২পুত্র ও ২ কন্যা সন্তানের জননী। নিজে সামান্য লেখাপড়া করলেও প্রবল মানসিক শক্তিতে সকল সন্তানদের লেখাপড়া শিখিয়ে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। বর্তমানে সকল সন্তানই সরকারী বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন পদে কর্মরত আছেন। ১ম পুত্র মোঃ আনিচুর রহমান, মেক্সিম গ্রুপের সিনিয়র এক্সিটিউভ অফিসার, ১ম কন্য মোছাঃ রেশমা খাতুন, সহকারি কমিশনার ভূমি, খোকসায় দায়িত্ব পালন শেষে  কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে আরডিসি হিসেবে কর্মরত আছে।২য় পুত্র মোঃ আতিকুর রহমান, প্রাইম বিশ^বিদ্যালয়ের প্রভাষক পদে কর্মরত আছেন। ২য় কন্যা মোছাঃ রিমা খাতুন, বর্তমানে জাহাঙ্গীর নগর বিশ^বিদ্যালয়ের ইংরেজী বিষয়ে মাস্টার্সে অধ্যয়নরত। 


মোছা: লিপি খাতুন ঃ 

শিক্ষা ও চাকুরী ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জনকারী নারী। তিনি মাগুরা জেলার বাবুখালী ইউনিয়নের রায়পুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা: মোসলেম উদ্দিন সরদার খুলনায় পুলিশ বিভাগে কর্মরত ছিলেন। পিতার চাকুরীর সুবাদে কার্তিককুল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে লেখাপড়া জীবন খুলনায় শুরু হয় এরপর সালেহা মাধ্যমিক বিদ্যালয় হতে ১৯৯২ সালে স্টার মার্কসহ এসএসসসি পাশ করেন। এরপর একই ইউনিয়নের মোঃ হাসান আল জাবেদ সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হই। স্বামীর সংসারে প্রতিকুল পরিবেশের মধ্য দিয়ে  ১৯৯৪ সালে দৌলতপুর কলেজ হতে প্রথম বিভাগে এইচএসসি, ১৯৯৬ সালে বিএল কলেজ হতে স্নাতক পাশ, ১৯৯৮ সালে একই কলেজ হতে স্নাতকোত্তর এবং খুলনা টিটি কলেজ হতে ২০০০ সালে বিএড ও ২০০২ সালে এমএড ডিগ্রী লাভ করেন। লেখাপড়া জীবন শেষে করে পিতার ইচ্ছায় ২০০৩ সালে ডুমুরশিয়া ডিসি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সহকারি শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন এবং ২০১৪ সালে একই বিদ্যালয়ে সহকারি প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদান করে অদ্যবধি কর্মরত আছেন। ২০০৫ সালে পিতা মারা যান এবং ২০১৪ সালে  স্বামী কিডনী রোগে আক্রান্ত হন, শুরু হয় ডায়লসিস এরপর ২০১৭ সালে খুলনার আবু নাসের হাসপাতালে মারা যান। এরপর শুরু হয় জীবন সংগ্রাম। শিক্ষাকতার পাশাপাশি নানা প্রতিকুলতা মারিয়ে স্বচ্ছলতার দারপ্রান্তে প্রবেশ করেন। তিনি তার সন্তানদের আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত করতে চান।


সুলতানা রউফুন্নাহারঃ   

সমাজ উন্নয়নে অসামান্য অবদানকারী নারী। ফরিদপুর জেলার বোয়ালমারী উপজেলার  কাদিরদি গ্রামের মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন। তার পিতা আঃ রাজ্জাক মোল্যা ব্যবসায়ী ও জনপ্রতিনিধি। মাতা কামনা বেগম ছিলেন একজন গৃহিনী, দুই ভাই ও দুই বোন। শিক্ষা জীবন শুরু হয় কাদিরদী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পরবর্তী কাদিরদী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে এসএসসি পাশ, কাদিরদী ডিগ্রী কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করেন। এরপর মাগুরা জেলার মহম্মদপুর উপজেলার গোপালনগর গ্রামের মোঃ রফিকুল ইসলামের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। বিবাহে পর স্বামীর সংসারে থেকেই প্রতিকুল পরিবেশের মধ্যে লেখাপড়া চালিয়ে যান। বিনোদপুর ডিগ্রী কলেজ থেকে বিএ পাশ করেন এবং ফরিদপুর রাজেন্দ্র কলেজ হতে এম এ পাশ করেন। বর্তমানে মাগুরা এলএলবি কলেজে এলএলবি সমাপ্ত করেছেন। সংসারের শতপ্রতিকুলতার মধ্যে তিনি এলাকায় নারীদের ভাগ্য উন্নয়নে ‘পরিবর্তন’ নারী উন্নয়ন নামে একটি নারী সংগঠন গড়ে তোলেন। বর্তমানে ২৫০ জন দুঃস্থ নারী নিয়ে তাদের জীবন  মান উন্নয়নে তিনি কাজ করে চলেছেন। এলাকার মানুষের ভালবাসায় তিনি ২০০৮ সালে উপজেলা মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে নির্বাচনে ৬০ হাজার ভোট পান। স্বামী মোঃ রফিকুল ইসলাম বর্তমানে ধোয়াইল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক হিসেবে সুনামের সহিত কর্মরত আছেন। বিবাহিত জীবনে তিনি একপুত্র ও এক কন্যা সন্তানের জননী। 

 


মোছাঃ রিক্তা পারভীনঃ 

জীবন সংগ্রমী নারী। উপজেলার চৌবাড়িয়া গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ২০০০ সালের ৩০শে জুন বেথুলিয়া গ্রামের মোঃ মনিরুজ্জামানের সাথে বিবাহ হয়। স্বামীর সংসারে অভাবের যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে স্থানীয় একটি বেকার উন্নয়ন সংস্থায় কাজ শুরু করেন এরপর বাস্কো ফাউন্ডেশনে প্রাক প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষাকতা শুরু করেন। এসময় অন্তসত্তা হয়ে পড়েন এর মধ্যদিয়ে তিনি এসএসসি পাশ করেন এবং উন্মুক্ত বিশ^বিদ্যালয়ের অধীনে এইচএসসি পাশ করেন।স্বামী পুনরায় বিবাহ করেন। স্বামীর সংসারে নির্যাতন সইতে না পেরে বাবার বাড়ীতে চলে আসেন এবং শুরু হয় জীবন সংগ্রাম। এরপর তিনি মাগুরা একটি ক্লিনিকে কাজ শুরু করেন। এরপর থেকেই তার ভাগ্যের চাকা ঘুরতে শুরু করে। ঢাকায় ইনসেপটা ঔষধ কোম্পানীতে চাকুরী শুরু করে এরপর মাগুরা আরাফাত ক্লিনিক, ল্যাবসিটি ক্লিনিক চাকুরী করেন। এসময় এলকায় মানুষের ভালবাসায় ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে সংরক্ষিত মহিলা মেম্বর পদে জয়লাভ করেন। বর্তমানে পিয়ারলেস ক্লিনিকে কর্মরত আছেন। এরপর থেকে তার আর পেছনে ফিরে তাকাকে হয় নি। স্বামী ভুল বুঝতে পেরে তার কাছে ফিরে আসেন। বিবাহিত জীবনে তিনি এক পুত্র ও কন্যা সন্তানের জননী। বড় ছেলে মাগুরা সোহরাওয়ার্দী কলেজে এবং মেয়ে বেথুলিয়া মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের অধ্যয়নরত। স্বামী বেথুলিয়া বাজারে একটি কীটনাশকের ব্যবস্যা পরিচালনা করছেন। শতবাধা পেরিয়ে বর্তমানে তিনি স্বাবলম্বী। ছেলেমেয়ে নিয়ে তিনি স্বচ্ছল জীবন যাপন করছেন ।  


বিলতা রানী বিশ্বাসঃ 

অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জনের ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জনকারী নারী। উপজেলার সদরের রুইজানী গ্রামের সঞ্জয় বিশ^াসের স্ত্রী বিলতা রানী বিশ^াস। বিবাহের পর স্বামীর সংসারে শত অভাবের মধ্যে নিজেকে আতœকর্মী হিসেবে গড়ে তুলতে নিজে হাঁস মুরগী পালন দিয়ে দিয়ে যাত্রা শুরু করেন। হাঁস মুরগী থেকে আয় দিয়ে প্রথম দুটি গাভী ক্রয় করেন বর্তমানে তার খামারে ১২ টি উন্নত জাতের গাভী ০৭টি বাছুর ও ষাড় সহ  সহ ২২টি গরু রয়েছে। এদের পালনের জন্য আমি নিজেই পরিশ্রম করি সাথে আমার মেয়েরা সহযোগিতা করে।  প্রতিদিন খামার থেকে ৮০ লিটার দুধ উৎপাদন হয়। যা দিয়ে গরুর খাবার সহ, কর্মচারী বেতন ও সংসারের ভরণ পোষণ ও ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার খরচ মেটানো হয়।  প্রতিটি গরুর দাম ২- ৩ লক্ষ টাকা। তার এই দীর্ঘ ২৫ বছরের বিবাহিত জীবনে অক্লান্ত পরিশ্রম করে দারিদ্র জয় করে সংসারে সফলতা এনেছে। তিনি অর্থনৈতিক ভাবে একজন সাবলম্বী নারী।