ঢাকা সোমবার ০৮ জুন ২০২৬ ২৫ ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ ৩৯ ই জিলহজ, ১৪৪৮ হিজরী
Ad

সাদা তাঁবুর নগরী ‘মিনা’

প্রকাশিত: ০৮ জুন ২০২৬, সোমবার, সময়ঃ ১২.২৬ পি.এম
সাদা তাঁবুর নগরী ‘মিনা’
www.dailyranggaprovat.com

রাঙা প্রভাত ডেস্ক :

ইসলাম ধর্মের অন্যতম স্তম্ভ পবিত্র হজের স্মৃতিবিজড়িত এক পুণ্যভূমির নাম মিনা। ভৌগোলিক অবস্থান, গভীর ঐতিহাসিক তাৎপর্য এবং হজের প্রধান প্রধান বিধিবিধান পালনের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে মিনা মুসলিম উম্মাহর হৃদয়ে এক আবেগের নাম। মক্কা নগরীর অদূরে অবস্থিত এই উপত্যকা কেবল একটি ভৌগোলিক স্থান নয়, বরং এটি আত্মত্যাগ, আনুগত্য এবং ইসলামের ইতিহাসের এক অনন্য সাক্ষী।

মিনা নামের উৎপত্তি ও রহস্য

‘মিনা’ শব্দটির নামকরণ নিয়ে ভাষাবিদ ও ইতিহাসবিদদের মাঝে কয়েকটি প্রচলিত ও প্রসিদ্ধ মত রয়েছে। উল্লেখযোগ্য কয়েকটি মত এখানে তুলে ধরছিÑ ১. অধিক রক্ত প্রবাহিত করা (ইমনা) : আরবি ‘মুনা’ বা ‘ইমনা’ শব্দ থেকে ‘মিনা’ এসেছে বলে অধিকাংশ ঐতিহাসিক মনে করেন। এর অর্থ হলো প্রবাহিত করা বা ঝরানো। হজের সময় এখানে লাখ লাখ কুরবানির পশুর রক্ত প্রবাহিত হয়, যা আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার এক অনন্য প্রক্রিয়া। এই ঐতিহাসিক কুরবানির ঐতিহ্যের কারণেই স্থানটির নাম মিনা। ২. আকাক্সক্ষা বা প্রত্যাশা (তামান্নি) : অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, মিনা শব্দের মূলে রয়েছে ‘তামান্নি’ বা আকাক্সক্ষা। প্রচলিত আছে, হজরত জিবরাইল (আ.) যখন হজরত আদম (আ.)-কে বিদায় জানাচ্ছিলেন, তখন তিনি জানতে চেয়েছিলেন আদম (আ.)-এর কোনো বিশেষ আকাক্সক্ষা আছে কি না। উত্তরে আদম (আ.) জান্নাত লাভের ইচ্ছা প্রকাশ করেন। সেই ‘তামান্নি’ থেকেই এই স্থানের নাম হয়েছে মিনা। ৩. জনসমাবেশ বা মানুষের ভিড় : প্রাচীন আরবদের ভাষ্যমতে, কোনো নির্দিষ্ট স্থানে যখন অগণিত মানুষের সমাগম হতো, তখন তাকে ‘মিনা’ বলা হতো। হজের মৌসুমে এখানে সারা বিশ্ব থেকে আসা লাখ লাখ মানুষের যে মহাসমাবেশ ঘটে, তার সঙ্গে এই নামকরণটি অত্যন্ত সামঞ্জস্যপূর্ণ।

ভৌগোলিক অবস্থান ও সীমানা

পবিত্র মক্কা নগরীর পূর্বদিকে পাহাড়বেষ্টিত এক শান্ত উপত্যকায় মিনা অবস্থিত। এটি মূলত মক্কা এবং মুজদালিফার মধ্যবর্তী একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থল। মসজিদুল হারাম বা পবিত্র কাবা শরিফ থেকে এর দূরত্ব প্রায় ৬ কিলোমিটার। মিনার ভৌগোলিক সীমানা অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট। এর উত্তর-পূর্বে রয়েছে বিখ্যাত ‘জামরায়ে আকাবা’, যেখানে শয়তানকে পাথর নিক্ষেপ করা হয়। আর দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত ‘ওয়াদিয়ে মাহসার’, যে উপত্যকায় একসময় আবরাহার বিশাল হস্তীবাহিনী আল্লাহর গজবে ধ্বংস হয়েছিল। শরিয়তের পরিভাষায় ও ভৌগোলিক সীমারেখায় মিনা প্রায় ১৬.৮ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত।

আত্মত্যাগের ঐতিহাসিক স্মৃতি

মিনার প্রতিটি ধূলিকণা হজরত ইবরাহিম (আ.) ও তাঁর পরিবারের অসামান্য আত্মত্যাগের সাক্ষী বহন করে। এখানেই আল্লাহ তায়ালা ইবরাহিম (আ.)-কে তাঁর প্রিয় পুত্র ইসমাইল (আ.)-কে কুরবানি করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। পিতা-পুত্রের সেই অবিচল আনুগত্য ও আত্মসমর্পণের মহান দৃশ্য পবিত্র কুরআনে সুরা আস-সাফফাতের ১০২-১০৫ নম্বর আয়াতে অত্যন্ত হৃদয়স্পর্শীভাবে বর্ণিত হয়েছে। শয়তান যখন ইবরাহিম (আ.)-কে আল্লাহর আদেশের পথ থেকে বিচ্যুত করার চেষ্টা করেছিল, তখন তিনি তাকে পাথর ছুড়ে মেরেছিলেন। সেই স্মৃতিকে ধরে রাখতেই হাজিরা আজও জামরাতে প্রতীকী পাথর নিক্ষেপ করেন।