হারিয়ে যাওয়া যাত্রাপালার ঐতিহ্য ফেরাতে বড়দিয়ায় বর্ণাঢ্য আয়োজনের প্রস্তুতি
মোঃ মনিরুজ্জামান চৌধুরী, নড়াইল প্রতিনিধি : একসময় গ্রামবাংলার রাত মানেই ছিল যাত্রাপালার মুগ্ধতা। সন্ধ্যা নামতেই মঞ্চে জ্বলে উঠত আলোর ঝলকানি, মাইকে ভেসে আসত শিল্পীদের কণ্ঠ, আর দর্শকদের করতালি ও উচ্ছ্বাসে মুখর হয়ে উঠত গোটা জনপদ। সময়ের বিবর্তনে আধুনিক প্রযুক্তি ও ডিজিটাল বিনোদনের দাপটে সেই চিরচেনা দৃশ্য আজ অনেকটাই হারিয়ে গেছে। বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী লোকসংস্কৃতিকে আবারও মানুষের মাঝে ফিরিয়ে আনতে নড়াইলের বড়দিয়ায় নেওয়া হয়েছে ব্যতিক্রমী উদ্যোগ।
নড়াইলের কালিয়া উপজেলার নড়াগাতী থানার ঐতিহাসিক বড়দিয়া বাজারে লক্ষ্মীপূজা উপলক্ষে আয়োজিত ঐতিহ্যবাহী মেলাকে কেন্দ্র করে এবার বসছে সামাজিক যাত্রাপালার আসর। এ আয়োজন ঘিরে মধুমতি ও নবগঙ্গা নদীর তীরবর্তী মেলা প্রাঙ্গণে চলছে বিশাল মঞ্চ নির্মাণের তোড়জোড়। মঞ্চ প্রস্তুতের কর্মব্যস্ততা আর উৎসবের আগাম আমেজে স্থানীয় মানুষের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা।
যাত্রাপালা বাংলার হাজার বছরের সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের এক অনন্য ধারক। একসময় গ্রামবাংলার মানুষের বিনোদনের অন্যতম প্রধান মাধ্যম ছিল এই লোকনাট্য। সামাজিক অসংগতি, অন্যায়ের প্রতিবাদ, মানবিক মূল্যবোধ, প্রেম-বিরহ, ইতিহাস ও ধর্মীয় কাহিনি নাটকীয় উপস্থাপনার মাধ্যমে তুলে ধরা হতো যাত্রাপালায়। শুধু বিনোদন নয়, সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি এবং সমাজ পরিবর্তনের বার্তা পৌঁছে দিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত এই শিল্পমাধ্যম।
কিন্তু কালের পরিক্রমায় সেই চিত্র বদলে গেছে। টেলিভিশন, সিনেমা, স্মার্টফোন, ফেসবুক, ইউটিউব ও টিকটকের মতো ডিজিটাল মাধ্যম মানুষের বিনোদনের জগৎকে বদলে দিয়েছে। হারিয়ে যাচ্ছে রাতভর যাত্রাপালা দেখার সেই উন্মাদনা। পৃষ্ঠপোষকতার অভাব, আর্থিক সংকট এবং পর্যাপ্ত দর্শক না পাওয়ায় অনেক যাত্রাদল বন্ধ হয়ে গেছে। পেশা পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছেন অসংখ্য শিল্পী ও কলাকুশলী। ফলে গ্রামবাংলার সমৃদ্ধ লোকসংস্কৃতির এই ধারাটি আজ অস্তিত্বের সংকটে।
এমন বাস্তবতায় বড়দিয়ায় যাত্রাপালার আয়োজন কেবল একটি বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান নয়; বরং হারিয়ে যেতে বসা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য পুনরুদ্ধারের একটি প্রশংসনীয় প্রয়াস। স্থানীয় প্রবীণদের প্রত্যাশা, এ আয়োজনের মধ্য দিয়ে নতুন প্রজন্ম যাত্রাপালার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও শিল্পীদের অভিনয়শৈলীর সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাবে। একই সঙ্গে লোকসংস্কৃতির প্রতি তরুণদের আগ্রহও বাড়বে।
মধুমতি ও নবগঙ্গার নদীবিধৌত বড়দিয়ার ঐতিহ্যবাহী মেলা বরাবরই স্থানীয় মানুষের মিলনমেলায় পরিণত হয়। এবার সেই উৎসবে যাত্রাপালার সংযোজন বাড়তি মাত্রা যোগ করবে বলে আশা করছেন সংস্কৃতিপ্রেমীরা।
আধুনিকতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে চলার পাশাপাশি নিজেদের শেকড় ও সাংস্কৃতিক পরিচয় ধরে রাখাও জরুরি। তাই বড়দিয়ার এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন স্থানীয় ঐতিহ্যপ্রেমীরা। তাঁদের প্রত্যাশা, এক রাতের আয়োজনেই যেন সীমাবদ্ধ না থাকে এই উদ্যোগ; বরং নিয়মিত পৃষ্ঠপোষকতা ও আয়োজনের মাধ্যমে যাত্রাপালার হারানো গৌরব আবারও ফিরে আসুক গ্রামবাংলার মঞ্চে।
এখন শুধু অপেক্ষা মঞ্চের পর্দা ওঠার। আবারও নদীর তীরে জেগে উঠুক ঢাক-ঢোলের আওয়াজ, শিল্পীদের সংলাপ আর দর্শকদের করতালি।
