ঘর পেলেও পাননি রাস্তা, জোয়ারে পানিবন্দি আশি পরিবার
বরিশাল প্রতিনিধি :
সরকারি আশ্রয়ণের ঘর পেয়েও স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারছেন না বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার দোয়ারিকা এলাকার আশিটি পরিবারের বাসিন্দারা। আশ্রয়ন প্রকল্পে যাতায়াতের জন্য নেই কোনো স্থায়ী সড়ক। যেকারণে জোয়ারে চারিপাশ পানিতে তলিয়ে যায়। তখন ঘর থেকে বের হতে পানির মধ্য দিয়ে হাঁটতে হয় ওই আশ্রয়নের বাসিন্দাদের।
সরেজমিনে দেখা গেছে, বাসিন্দাদের যাতায়াতের জন্য প্রায় চার বছর আগে নির্মাণ করা হয়েছিল একটি কাঠের সেতু। কিন্তু দুই বছরের মধ্যেই সেটি ভেঙে গেছে। এরপর দুই বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও সেখানে স্থায়ী যাতায়াত ব্যবস্থা তৈরি হয়নি। ফলে প্রতিদিনই দুর্ভোগ নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে আশ্রয়নের বাসিন্দাদের।
সুগন্ধা নদীর তীরে পাশাপাশি দুটি আশ্রয়ন প্রকল্পে রয়েছে আশিটি ঘর। এসব ঘর থেকে বের হওয়ার জন্য নির্দিষ্ট কোনো সড়ক নেই। একটি ইটভাটার ভেতর দিয়ে বের হওয়ার পথ থাকলেও গেট বন্ধ থাকায় অনেক সময় পানির মধ্য দিয়ে চলাচল করতে হয়।
অন্যদিকে ছোট একটি খাল পার হয়ে স্থানীয় কয়েকটি বাড়ির ভেতর দিয়ে মূল সড়কে ওঠার সুযোগ থাকলেও সেখানেও নানা বিড়ম্বনার মুখে পড়তে হয় বাসিন্দাদের।আশ্রয়নের বাসিন্দা মো. ইলিয়াস (৫০) বলেন, রাস্তা না থাকায় প্রতিদিনই নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। রাস্তার জন্য বিভিন্নজন বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন কিন্তু বাস্তবে তা আলোর মুখ দেখেনি।
রফিকুল ইসলাম বলেন, একসময় মোগো জমি-জায়গা, ঘরবাড়ি-সবই আছিল। নদীভাঙনে হেইসব কিছু হারাইছি। চাইর বছর আগে সুগন্ধা নদীর পারে দোয়ারিকা আশ্রয়নে দুই শতক জাগা আর একখান ঘর পাইছি। কিন্তু চলাচলের কোনো রাস্তা নাই। জোয়ার আইলেই চারপাশ পানিতে ডুইবা যায়।
তিনি আরও বলেন, চার বছর আগে যাতায়াতের লাইগ্যা একখান কাঠের পুল বানাইয়া দিছিলো। কিন্তু দুই বছরের মধ্যেই হেইডা ভাইঙ্গা গেছে। হেইরপর থেইকা প্রায় দুই বছর ধইরা মোগো খুব কষ্ট কইরা চলাফেরা করতে হয়। পানির মইধ্যে দিয়া, মানুষের জমির ওপর দিয়া চলাফেরা করি। জোয়ার আইলে কষ্ট আরও বাড়ে। ঘর থেইক্যা বাহির হইতে গেলেও অনেক ঝামেলা পোহাইতে হয়। নদী সব কাইড়া নিছে। এহন আশ্রয়নের ঘর পাইছি ঠিকই, কিন্তু রাস্তা না থাকায় এহনও কপালে সুখ নাই।
শুধু রফিকুল ইসলাম নন, আশ্রয়নের অন্য বাসিন্দারাও একই ধরনের দুর্ভোগের কথা জানিয়ে বলেন, আশ্রয়ন প্রকল্পে প্রায় ৮০ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। তাদের প্রতিদিন খালের পানি মাড়িয়ে স্কুলে যাতায়াত করতে হয়।
বাবুগঞ্জ সরকারি পাইলট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রবিউল ইসলাম বলেন, আমাদের এখান থেকে বের হওয়ার জায়গা নেই। একটা কাঠের পুল ছিল, সেটাও নষ্ট হয়ে গেছে। স্কুলে যেতে হলে মূল সড়কে ওঠার আগে পানির মধ্য দিয়ে যেতে হয়। অনেক সময় জামা-কাপড় হাতে নিয়ে যেতে হয়। আমরা সরকারের কাছে একটি রাস্তার জন্য আবেদন করছি।
আশ্রয়নের বাসিন্দা শেফালী বেগম বলেন, আমরা অসুস্থ হলে কোলে করে রাস্তায় নিতে হয়। একটা ভ্যান নিয়েও হাসপাতালে যাওয়ার অবস্থা নেই। কিছুদিন আগে আমি অসুস্থ হলে চার-পাঁচজন মিলে কাঁধে করে আমারে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, জোয়ারের পানি বাড়লে আশ্রয়ন প্রকল্পের চারপাশ ডুবে যায়। এতে শিশু, শিক্ষার্থী, নারী ও বয়স্কদের দুর্ভোগ সবচেয়ে বেশি হয়। বিশেষ করে জরুরি প্রয়োজনে কোনো রোগীকে দ্রুত চিকিৎসার জন্য নিয়ে যাওয়াও কঠিন হয়ে পরে।
সূত্রমতে, ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারের পুনর্বাসনের জন্য আশ্রয়ণ প্রকল্প-২-এর আওতায় ২০২১ সালে বাবুগঞ্জ উপজেলার দোয়ারিকা এলাকায় ৮০টি পরিবারকে দুই শতক করে জমি ও ঘর দেওয়া হয়। সরকারি অর্থায়নে নির্মিত এসব ঘর সুগন্ধা নদীর তীরে দুটি আশ্রয়ন প্রকল্পে স্থাপন করা হয়েছে।
ঘর নির্মাণের পর বাসিন্দাদের যাতায়াতের জন্য তৎকালীন উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে প্রায় ২০০ ফুট দীর্ঘ একটি কাঠের সেতু নির্মাণ করা হয়। কয়েক বছরের মধ্যেই সেটি নষ্ট হয়ে যাওয়ার পর নতুন করে স্থায়ী যাতায়াত ব্যবস্থা তৈরি হয়নি বলে জানিয়েছেন বাসিন্দারা।
এ বিষয়ে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান সুমন সিকদার বলেন, রাস্তা না থাকায় আশ্রয়নের বাসিন্দারা কষ্টে যাতায়াত করছে বলে জানতে পেরেছি। আমি বিষয়টি ইউএনওকে অবহিত করবো এবং সরেজমিনে পরিদর্শন করে যথাসম্ভব যাতায়াতের ব্যবস্থা করবো।
বাবুগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার আসমা উল হুসনা বলেন, বিষয়টি আমি আপনাদের কাছ থেকেই অবহিত হলাম। আশ্রয়নের ৮০টি পরিবারের জন্য কেন রাস্তা করা হয়নি, সে বিষয়টি সরেজমিনে গিয়ে দেখে যতো দ্রুত সম্ভব উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।
