ঢাকা বুধবার ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১৫ ই আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ ৩৫ ই জিলহজ, ১৪৪৮ হিজরী
Ad

পায়রা বন্দর মহল্লা পালা পাড়া পল্লীতে পূর্ণবাসন আছে জীবিকা নেই

প্রকাশিত: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, মঙ্গলবার, সময়ঃ ০৭.৩৮ পি.এম
পায়রা বন্দর মহল্লা পালা পাড়া পল্লীতে পূর্ণবাসন  আছে জীবিকা নেই
www.dailyranggaprovat.com

অশোক মুখার্জী কলাপাড়া পটুয়াখালী :  পায়রা বন্দরে জমি অধিগ্রহণে ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন পল্লী মহল্লাপাড়া আবাসনের ৬২৮ পরিবারের অন্তত দুই তৃতীয়াংশ মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। অন্তত এক শ’ পরিবার পুনর্বাসনের ঘর ভাড়া দিয়ে কাজের সন্ধানে অন্যত্র চলে গেছেন। এক সময়ে এদের অধিকাংশ পরিবার ছিল কৃষি ও জেলে পেশা নির্ভর। জমিজিরেত, খাল-পুকুর-জলাশয় হারিয়ে এই পরিবারগুলোর এখন দুরবস্থা চলছে। পেশায় সংকটকাল চললেও এদের মিলছে না কর্ম। 

পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষ প্রত্যেক পরিবারকে কর্মসংস্থানের আশ্বাস দিলেও বন্দর পুর্নাঙ্গভাবে চালু না হওয়ায় কর্ম মেলেনি। ফলে বেকার পরিবারগুলোর জীবনে চরম দুরবস্থা নেমে এসেছে। চলছে টানাপোড়েন। তেল ছাড়া কোন কিছুই এদের কিনতে হতো না। এখন তাঁদেও সব কিনতে হয়। ১২ মাস কৃষি উৎপাদন, মৎস্য চাষ, গবাদিপশু পালন কিংবা কোন না কর্ম করা মানুষগুলো কর্মস্থল হারিয়ে বিপাকে পড়েছেন। ২০২১ সালের পর থেকে এই পরিবারগুলো মূলত কর্মহীন হয়ে আছেন। অনেকে কষ্টক্লেশ করে ক্ষুদে ব্যবসায় নেমেছেন। কিন্তু তাতে সংকুলান হচ্ছে না সংসারের। ক্ষতিপুরণের যে পরিমাণ টাকা যারা পেয়েছেন তাও অধিকাংশ খরচ হয়ে গেছে। অনেকে আবার এখনও ঘুরছেন ক্ষতিপুরনের টাকা তোলার জন্য। মোট কথা এক মহা সংকটে দিন পার করছেন এই পরিবারগুলোর অধিকাংশ মানুষ। চোখে না দেখলে কিংবা কথা না বললে এসব মানুষের সমস্যা বাইরে থেকে বোঝার উপায় নেই।

সরেজমিনে গেলে, আবাসনের বাসীন্দা হাবিবুর রহমান তালুকদার (৬২) জানান, ধঞ্জুপাড়া গ্রামে ছিল তার সাজানো-গোছানো বাড়িঘর। ছিল ফসলি জমি। মাছ চাষ করতেন। গবাদপশু পালন করতেন। করতেন কৃষি কাজ। ৩২ বিঘা জমির মালিক এই মানুষটি এখন মহল্লাপাড়ার আবাসনের এ টাইপের ১৩৫ নম্বর একতলা ভবনে থাকছেন। ২০২২ সালের পরে যেন ঘরটিতে বন্দি হয়ে আছেন। ঘরটি ছাড়া এক শতক জমিও নেই। আয় বলতে তিন কক্ষের ঘরটির সামনে টিনের বেড়া ও ছাপড়া দেয়া ছোট্ট দোকানটি। 

বললেন, জমির ক্ষতিপুরনের সব টাকা এখনও তুলতে পারেননি। যা পেয়েছিলেন সব শেষ। একসময় তেল ছাড়া কিছু কেনা লাগত না তার। আর এখন পানি পর্যন্ত কিনতে হয়। মানুষটি দিশেহারা হয়ে আছেন। জমির ক্ষতিপুরনের যে পরিমাণ টাকা তুলেছেন তাতে এলও অফিসের দালালকে ৬-৭ পার্সেন্ট ঘুষ দিতে হয়েছে। বাকি টাকার আশা ছেড়ে দেয়ার কথা ব্যক্ত করলেন। কৃষক পেশার এই মানুষটি প্রায় পাঁচটি বছর পেশা হারিয়ে এখন দোকানি হয়েছেন। কিন্তু চোখে সব অন্ধকার দেখছেন। জীবীকার চাকা সচল রাখতে পারছেন না। বললেন, ‘এখন আর কোন পুঁজি নেই। পায়রা বন্দরও চালু হয় নাই। মাঝখান দিয়ে জমিজমা-বাড়িঘর হারাইয়া নিঃস্ব হইয়া গ্যালাম।’ তার দাবি, পায়রা পোর্ট কর্মসংস্থানের জন্য রাজমিস্ত্রির প্রশিক্ষণ দিয়েছে। কিন্তু কোন কাজে লাগেনি। 

হাবিবুর রহমানের আরও অভিযোগ, পায়রা বন্দর ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য এই আবাসনে ৬২৮ পরিবারের জন্য ঘর বরাদ্দ দিয়েছে। মসজিদ করেছে। স্কুল করেছে। কবরস্থান করেছে। কর্মসংস্থানের জন্য ১০ কক্ষের একটি মার্কেটও করেছে। কিন্তু ওই দোকান যাদের বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে তা সঠিক হয়নি। দেখালেন সব কয়টি দোকান বন্ধ। তালা ঝুলছে। কেউ দোকান করে না। প্রকৃত যাদের ব্যবসা করার সুযোগ আছে তাঁদেও কাউকে দোকান দেওয়া হয়নি বলে অধিকাংশের অভিযোগ। এমনকি বর্তমানে ঘরটির কী অবস্থা জিজ্ঞেস করায় তার ভাষ্য ছিল, ‘ এয়াতো এহনই ফাইট্যা চিইর‌্যা গেছে।’ অর্থাৎ ঘরটা নষ্ট হয়ে গেছে। বহু ঘরের ছাদ ড্যাম হয়ে গেছে। মেরামত করা দরকার। তবে বর্তমানে ঘরের দলিল পাচ্ছেন বলেও জানালেন মানুষটি।

এ টাইপের ১২১ নম্বর ঘরে বসবাস করছেন মৃজাগঞ্জ উপজেলার বাসীন্দা মনিরা আক্তার ও সাইদুল দম্পতি। তারা এই ঘরটিতে ভাড়ায় থাকেন। যার নামে বরাদ্দ গিয়াস উদ্দিন পল্লান ছিলেন মুন্সীপাড়া গ্রামের বাসীন্দা। ঘর বরাদ্দ পাওয়ার পরে তাঁরা কেউ এখানে থাকেননি। জানালেন মনিরা আক্তার, নিজে দোকান করেন। সেলাই মেশিনে কাজ করেন। সংসারে স্বামীর সঙ্গে এভাবে যোগান দেন। স্বামী সাইদুল আগে পায়রা বন্দরের কাজ করতেন। এখন এখানে কাজ নেই তাই ঢাকায় গিয়ে কাজ করছেন। ক্যারেন অপারেটরের কাজ করেন সাইদুল।

বড় পাঁচ নং গ্রামের বাসীন্দা ছিলেন পলাশ খান। এখন মহল্লাপাড়া আবাসনের বাসীন্দা। এ টাইপের ১০৭ নম্বর ঘরে বসবাস। ছয় জনের সংসার। বাবা-মা এখনও অন্যত্র থাকেন। সবাই একত্রে বাসায় আসলে জায়গার সমস্যা হয়। জানালেন পলাশ খান, মাত্র দশ হাজার টাকা শতক প্রতি ক্ষতিপুরণ দেয়া হয়েছে। তাও নয় বিঘার টাকা তুলতে পারেননি। উল্টো ঘুরতে ঘুরতে জমানো টাকা নষ্ট করেছেন। প্রচন্ড ক্ষোভ মানুষটির মনে। বললেন, ‘ প্রতিদিন মাছ খেতেন। চাল-ডাল মাছ কিছুই কিনতে হতো না। এখন নিঃস্ব। সব শ্যাষ। এখন খাইয়া লইয়া কেমনে বাচুম তা বুঝতে পারছি না।’ এমনকি ৮০০ থেকে ১৫ শ’ টাকার কারেন্ট বিল ঠিকমতো দিতে পারছেন না। 

কষ্টের যেন শ্যাষ নেই মানুষটির। বি টাইপের ২৩৯ নম্বর ঘরের বাসীন্দা এখন জুলেখা বেগম ও সৈয়দ মৃধা দস্পতি। প্রবীণ এই মানুষ দুইটি বললেন, ‘বানাতিপাড়ায় থাকতাম। ওখানে কাজকাম করতাম। ভেড়া পালতাম। হাক (শাক)-পাতা টোহাইয়া খাইতাম। এহন সব কেনা লাগে।’ এরাও জানান, তখন পোর্ট বুঝি নাই। বুঝেছিলাম আমাদের ভাগ্য ফেরবে। কিন্তু হলো উল্টোটা। যতটুকু কৃষিজমি ছিল তার টাকা এখনও পায়নি। এখন এই দম্পতি পুরো বেকার। ইনকাম নেই। একই কষ্টের কথা জানালেন, বি টাইপের ঘরের বাসীন্দা মজনু হাওলাদার। এভাবে মহল্লাপাড়া আবাসন পুনর্বাসন পল্লীর ৬২৮ পরিবারের মধ্যে ৬০ শতাংশের বেহাল দশা। বেকারত্ব মানুষগুলোকে অস্থির করে তুলেছে। যেন দিশেহারা হয়ে গেছেন।

এমনকি, অন্তত ১০০ পরিবার তাঁদের বরাদ্দের ঘর ভাড়া দিয়ে গেছে। তারা অন্যত্র থাকেন। বর্তমানে আবাসনের বাসীন্দাদের অধিকাংশের কোন কাজ নেই। বাড়িঘরের ক্ষতিপুরনের টাকাও শেষ হয়ে গেছে। পোর্ট কেন্দ্রীক তাঁদের কর্মসংস্থানের ছয় বছর আগের সেই স্বপ্ন্গুলো এখন যেন দুঃস্বপ্নের রাতে পরিণত করেছে। রাতের ঘুম হারাম হয়ে গেছে জীবন-জীবীকার যোগানের দুশ্চিন্তায়।

লালুয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শওকত হোসেন তপন বিশ্বাস জানান, পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষ তখন বলেছিল এই ঘরগুলো ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে উপহার দেয়া হয়েছে। তাঁদের প্রত্যেক পরিবার থেকে বন্দরে কর্মসংস্থানের কথা ছিল। উল্টো কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে যেসব ট্রেডে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে, তা ছিল অবাস্তব। বহুলাংশে অর্থহীন। এসব ঘর নিম্নমানের সামগ্রি দিয়ে করা হয়েছে। বিশেষ করে ছাঁদগুলো এখনই সংষ্কার করা প্রয়োজন। কিন্তু যারা থাকছেন তারা তো পেটের যোগান দিতে পারছেন না। ঘর মেরামত করবেন কিভাবে? অনেকে ভাড়া দিয়েছেন। বিক্রি করেছেন কেউ কেউ। কাঁজের সন্ধানে এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছেন বলেও জানালেন তপন বিশ্বাস। 

এ ব্যাপারে পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষের ‘অবকাঠামোগত সহায়ক সুবিধাসমূহের উন্নয়ন’ (ডিআইএসএফ) (Development of Infrastructure Support Facilities) প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ নাজমুল হক বলেন, ওই আবাসনের বাড়িগুলো বরাদ্দপ্রাপ্ত জনগণের ব্যক্তিগতভাবে মেরামত করার নিয়ম রয়েছে। দোকান বরাদ্দের বিষয়ে তিনি বলেন, বন্দরের স্টেট বিভাগ থেকে একাধিকবার দোকান বরাদ্দের প্রচেষ্টা নেওয়া হয়েছে।