কালিয়ার মধুমতির ভাঙনে বিলীনের পথে চর মধুপুর, হারিয়ে যাচ্ছে গ্রাম
মোঃ মনিরুজ্জামান চৌধুরী, নড়াইল প্রতিনিধি : নড়াইলের কালিয়া উপজেলার নড়াগাতী থানার পহরডাঙ্গা ইউনিয়নের চর মধুপুর। একসময় যে গ্রামে ছিল মানুষের কোলাহল, ঘরবাড়ি, গাছপালা আর ফসলের মাঠ—সেই গ্রামের অস্তিত্ব এখন মধুমতি নদীর অব্যাহত ভাঙনের মুখে। অশান্ত নদীর স্রোতে প্রতিদিনই ভাঙছে পাড়, বিলীন হচ্ছে বসতভিটা ও আবাদি জমি। নদীর কিনারে দাঁড়িয়ে থাকা পরিবারগুলোর চোখেমুখে এখন একটাই আতঙ্ক—কখন চলে যায় শেষ আশ্রয়টুকুও।
স্থানীয়দের ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে মধুমতি নদীর ভাঙনে চর মধুপুরের বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ভাঙনের কবলে পড়ে অনেক পরিবার ইতোমধ্যে বসতভিটা হারিয়েছে। কেউ ঘর সরিয়ে নিয়েছেন নিরাপদ স্থানে, কেউবা শেষ সম্বলটুকু আঁকড়ে ধরে অপেক্ষা করছেন অনিবার্য পরিণতির। তাদের অভিযোগ, ভাঙনের প্রকোপ বাড়লেও স্থায়ী প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা না থাকায় সংকট ক্রমেই তীব্র হচ্ছে।
সরেজমিনে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নদীর তীরবর্তী কয়েকটি বাড়ি এখন মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে। বসতভিটার কাছাকাছি চলে এসেছে নদীর স্রোত। দিনের আলোয় ভাঙন দেখা গেলেও রাতের অন্ধকারে আতঙ্ক আরও বাড়ে। পরিবারের সদস্যরা ঘুমিয়ে পড়ার পর হঠাৎ পাড় ধসে গেলে কী হবে—এমন শঙ্কায় অনেকেই রাত কাটাচ্ছেন নির্ঘুম।
ভুক্তভোগী মিজান মল্লিক বলেন, “সব হারিয়ে এখন শুধু পৈতৃক ভিটাটুকু আছে। সেটিও কখন নদীগর্ভে চলে যায়, সেই আতঙ্কে রাতদিন ঘুমাতে পারি না। আশেপাশে আর বাড়ি নেই। এখন আমার বাড়িটিও কখন হারিয়ে যায়—সেই চিন্তায় আছি।”
স্থানীয় বাসিন্দা আলহাজ্ব মল্লিক বলেন, “জন্ম থেকেই এই ভাঙন দেখে আসছি। বছরের পর বছর নদীভাঙনে আমরা পরিবার নিয়ে অসহায় হয়ে পড়েছি।”
স্থানীয়দের প্রশ্ন—একটি জনবসতি যখন ধীরে ধীরে নদীগর্ভে হারিয়ে যাচ্ছে, তখন স্থায়ী নদীতীর সংরক্ষণে কার্যকর উদ্যোগ কতটা নেওয়া হয়েছে? তাদের দাবি, শুধু ভাঙনের পর ক্ষয়ক্ষতি বিবেচনা না করে আগেই ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।
১০ নম্বর পহরডাঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মল্লিক মাহমুদুল ইসলাম বলেন, “চর মধুপুরে নদীভাঙনের প্রকোপ অনেক বেড়েছে। দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য অনুরোধ করছি। ইতোমধ্যে কালিয়া উপজেলা প্রশাসনকে লিখিতভাবে বিষয়টি জানানো হয়েছে।”
কালিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ জিন্নাতুল ইসলাম বলেন, “চর মধুপুরের নদীভাঙনের বিষয়টি ইতোমধ্যে অবগত হয়েছি। দ্রুত যথাযথ কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি অবহিত করা হবে এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের জন্য জানানো হয়েছে।”
এদিকে নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে থাকার কথা জানিয়েছেন নড়াইল-১ আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ্ব বিশ্বাস জাহাঙ্গীর আলম। তিনি বলেন, “চর মধুপুর গ্রামের নদীভাঙনকবলিত মানুষের দুঃখ-দুর্দশার বিষয়টি আমি জেনেছি। দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। নদীভাঙনকবলিত এলাকার মানুষের পাশে অতীতেও ছিলাম, এখনো আছি এবং থাকব, ইনশাআল্লাহ।”
তবে স্থানীয়দের প্রত্যাশা, বক্তব্য ও আশ্বাসের মধ্যে যেন আটকে না থাকে নদীভাঙন প্রতিরোধের উদ্যোগ। কারণ নদীভাঙনে একবার বসতভিটা হারালে শুধু একটি ঘর নয়—হারিয়ে যায় মানুষের জমি, গাছপালা, স্মৃতি, সামাজিক বন্ধন এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে গড়ে ওঠা ঠিকানা।
চর মধুপুরের বাসিন্দাদের দাবি, জরুরি ভিত্তিতে ঝুঁকিপূর্ণ নদীতীর পরিদর্শন করে কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে প্রয়োজন হলে জিওব্যাগ বা অন্যান্য প্রকৌশলগত ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি নদীতীর সংরক্ষণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হবে। ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসন ও জরুরি সহায়তার বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, এখনই কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে মধুমতির ভাঙনে চর মধুপুরের অবশিষ্ট বসতভিটাগুলোও একে একে নদীগর্ভে চলে যেতে পারে। তখন মানচিত্রে হয়তো এলাকার নাম থাকবে, কিন্তু হারিয়ে যাবে শত বছরের জনবসতি ও মানুষের পূর্বপুরুষের স্মৃতিবিজড়িত সেই ঠিকানা।
এ অবস্থায় চর মধুপুরকে রক্ষায় সংশ্লিষ্ট পানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষসহ প্রশাসনের দ্রুত, সমন্বিত ও টেকসই উদ্যোগই এখন নদীপাড়ের মানুষের প্রধান প্রত্যাশা।
